ধানক্ষেতে ছোট মাছের চাষ করতে আগ্রহী, বিস্তারিত জানাবেন কি?

1 answer

ভাত ও মাছ বাংলাদেশের জনগণের প্রধান খাদ্য। আর এ দু’টি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর চাষযোগ্য আবাদী জমি ও মাছ চাষের জলাশয়। প্রায় ১৫ কোটি জনসংখ্যার ঘন বসতিপূর্ণ ছোট এ দেশে দু’টো সম্পদই অত্যন্ত সীমিত এবং দিন দিন তা আরো সীমিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মাছের চাহিদাও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এখনো আমাদের দেশের অর্থনীতি, পুষ্টি এবং কর্মসংস্থানে মাছ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। পুষ্টিবিদদের মতে গড়ে জনপ্রতি বছরে ১৮ কেজি মাছের প্রয়োজন কিন্তু বর্তমানে মাছ গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ১৩.৫ কেজি। যা আমদের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। কেবলমাত্র পুকুরে মাছ চাষের মাধ্যমে এ ব্যাপক চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় জমির বহুবিধ ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে ধানক্ষেতে মাছ চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে প্রায় ৬.৯৯ মিলিয়ন একর ধানী জমিতে বছরে ৪-৬ মাস পানি থাকে যা ধানের সাথে মাছ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এসব জমিতে ধানের সঙ্গে মাছ ও চিংড়ি চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
 
ধানক্ষেতে মাছচাষ একটি সমন্বিত চাষ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে স্বল্প ব্যয়ে, অল্প শ্রমে এবং সহজ ব্যবস্থাপনায় একই জমিতে একই সঙ্গে বা পর্যায়ক্রমে একের অধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব যা জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধানক্ষেতে মাছ চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করলে ধানের ফলন   ১২-১৭% এবং খড়ের ফলন ১৪-২০% বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকের আর্থিক উন্নতির সাথে সাথে আমিষ জাতীয় খাদ্যের ঘাটতিও পূরণ হয়।
 
ধানক্ষেতে ছোট মাছ চাষের গুরুত্ব
আমাদের দেশে পূর্বে ধানক্ষেতে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু ষাটের দশকের দিকে ধানের ফলন বাড়ানোর জন্য এ দেশে উচ্চ ফলনশীল ধান চাষের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লবের সূত্রপাত হয়। ফলে এসব ধানী জমিতে মাছের প্রাপ্যতা দ্রুত কমতে থাকে এবং বর্তমানে নেই বললেই চলে। তথাপি এখনো আমাদের দেশের গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের আমিষ জাতীয় খাদ্যের চাহিদা পূরণের জন্য এসব ছোট মাছের ওপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। কারণ, তারা অপেক্ষাকৃত দামী ও বড় মাছ ক্রয়ে সমর্থ নয়। এসব ছোট মাছে আমিষের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় খনিজ (Minarel) উপাদান রয়েছে যা স্বাস্থ্য রক্ষায় খুবই প্রয়োজন।
 
আমাদের দেশে প্রায় ১৫০টি বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। আধুনিক পদ্ধতিতে পুকুরের পাশাপাশি ধানক্ষেতেও এসব ছোট মাছের চাষ করে এ দেশের মানুষের অপুষ্টিজনিত রোগ বিশেষকরে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করা অনেকাংশেই সম্ভব। বর্তমানে ১৬ টি প্রজাতির ছোট মাছ চাষের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে মলা, পুঁটি এবং চিংড়ি ধানক্ষেতে চাষের জন্য খুবই উপযোগী।
 
ধানক্ষেতে মাছ চাষের সুবিধা

  • ধানের সাথে মাছচাষ করলে একই জমি থেকে অতিরিক্ত ফসল হিসেবে মাছ পাওয়া যায়।
  • মাছ ধানের অনিষ্টকারী পোকা-মাকড় খায় এবং ক্ষেতে আগাছা জন্মাতে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে ধানের ফলন বেশি হয় এবং কীটনাশক ও নিড়ানী খরচ কম লাগে।
  • মাছের বিষ্ঠা ক্ষেতের উর্বরতা বৃদ্ধিতে সার হিসেবে কাজ করে।
  • পোনা ক্রয়ের খরচ ছাড়া তেমন বাড়তি পুঁজির প্রয়োজন হয় না।
  • সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় জৈবিক পদ্ধতিতে বালাই দমনে মাছ কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
  • এ পদ্ধতির চাষ কার্যক্রমে খাদ্য প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না।
  • কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।

 
ধানক্ষেতে ছোট মাছ চাষ পদ্ধতি
জমির ধরণ অনুযায়ী সাধারণত ২ পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে মাছ চাষ করা যায়। যেমন-
১। যুগপৎ পদ্ধতি (Simultaneous or Concurrent method)
২। পর্যায়ক্রম পদ্ধতি (Alternate or Rotation method)
 
যুগপৎ পদ্ধতি
যুগপৎ পদ্ধতিতে ধান ও মাছ একই জমিতে এক সঙ্গে চাষ করা হয়। এ পদ্ধতিতে ধান হচ্ছে মুখ্য ফসল এবং মাছ হচ্ছে অতিরিক্ত ফসল। মধ্যম ও নিচু জমিতে যেখানে ৪-৬ মাস পানি থাকে, সেখানে আমন ধানের সাথে মাছ চাষ করা যায়। আবার বোরো মৌসুমে যেসব জমি সেচ সুবিধার আওতাধীন সেসব জমিতেও এ পদ্ধতিতে ধানের সাথে মাছ চাষ করা যেতে পারে। এছাড়া উপকূলীয় ধানী জমিতে বর্ষাকালে ধানের সাথে ছোট মাছ ও চিংড়ি চাষ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন-
          ক) এক ফসলা পদ্ধতি
          খ) দু’ফসলা পদ্ধতি
 
এক ফসলা পদ্ধতিতে মাছ ও ধান একই সঙ্গে একই জমিতে করা হয় এবং ধান কাটার পর মাছ ধরা হয়। আর দু’ফসলা পদ্ধতিতে একই মজুদের মাছকে পর পর দুই ফসলে রাখা হয়। অর্থাৎ প্রথম ফসলটি কাটার পর মাছকে ক্ষেতের এক প্রান্তের গর্তে বা মিনি পুকুরে রেখে দেয়া হয়। অতঃপর পরবর্তী ফসলে আবার ক্ষেতে ছাড়া হয় এবং দ্বিতীয় ফসল কাটার পর মাছ ধরা হয়।
 
এ পদ্ধতির সুবিধাগুলো নিম্নরূপ

  • এ পদ্ধতিতে এক সঙ্গে অল্প শ্রম ও স্বল্প খরচে দু’টি ফসল পাওয়া যায়।
  • মাছ ধানের অনিষ্টকারী কীট-পতঙ্গ ও আগাছা খেয়ে এদের উপদ্রব কমিয়ে দেয়। ফলে এর জন্য বাড়তি পুঁজির প্রয়োজন হয় না।
  • মাছের বর্জ্য ক্ষেতে জৈবিক সার হিসাবে কাজ করে।
  • মাছের চলাচলে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং পুষ্টি উপাদানসমূহ অধিকতর সহজলভ্য হয়।
  • ধান চাষের খরচ কম হয়, ফলন বৃদ্ধি পায়, ফলে মুনাফাও বেশি হয়।

 
পর্যায়ক্রম পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে একই জমিতে ধান ও মাছ পর্যায়ক্রমে চাষ করা হয়। সাধারণত ধান কাটার পর মাছ চাষ করা হয় এবং মাছ আহরণের পর ধান চাষ করা হয়। যেসব নিচু জমি বর্ষাকালে প্লাবিত হয় এবং যেখানে কেবলমাত্র শীতকালে বোরো ধানের চাষ করা হয়, সেসব জমি এ পদ্ধতির জন্য উপযোগী। তাছাড়া সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় যেখানে বর্ষাকালে লোনাপানির চিংড়ি চাষ করা যায় না সেসব জমিতেও চিংড়ির পরে ধানের চাষ করা যেতে পারে। বর্ষার সময় ধানের সাথে স্বাদু পানির চিংড়ি ও মাছের চাষ করা যেতে পারে।
 
পর্যায়ক্রম পদ্ধতির সুবিধা

  • এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে ধান থাকে না বলে ধান ক্ষেতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি রাখা যায়।
  • মাছ চাষের জন্য যে সব সার প্রয়োগ করা হয় সেগুলোর অব্যবহৃত অংশ এবং মাছের বর্জ্য ধানের জন্য সার হিসেবে কাজ করে।
  • ধানের পর মাছ চাষ করা হয় বলে পোকা-মাকড়ের জীবন চক্র ব্যাহত হয়। ফলে পরবর্তীতে ধানক্ষেতে পোকার আক্রমণ কম হয়।
  • ধানের পরে মাছ চাষ করাতে জমিতে আগাছার উপদ্রব কমে যায় এবং জমির মাটি নরম থাকে বিধায় অল্প চাষে পরবর্তীতে ধানের চারা রোপন করা যায়।
  • ধান কাটার পর ধান গাছের গোড়ার অংশ পানিতে পঁচে গিয়ে প্রচুর প্লাঙ্কটন জন্মায়, যা মাছের উৎকৃষ্ট খাদ্য।
  • এসব জমির বেশীরভাগ বহুমালিকানাধীন হওয়ায় সমবায়ভিত্তিক বা সমাজভিত্তিক মাছ চাষের সুবিধা রয়েছে।

 
 
ধানক্ষেতে ছোট মাছ চাষের সমস্যা
ধানক্ষেতে ছোট মাছ চাষে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন-

  • বর্ষাকালে অতি বৃষ্টিতে ধানক্ষেতের পানি আইল উপচিয়ে বা বন্যায় প্লাবিত হয়ে মাছ বের হয়ে যেতে পারে।
  • খরা বা অনাবৃষ্টিতে ক্ষেতের পানি শুকিয়ে মজুদকৃত পোনা মারা যেতে পারে।
  • কাঁকড়া ও ইদুর ক্ষেতের আইলে গর্ত করার ফলে পানি বের হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া পানি কমে গেলে সাপ, ব্যাঙ, বক, শিয়াল ইত্যাদি সহজে মজুদকৃত পোনা খেয়ে ফেলতে পারে।
  • ধানক্ষেতে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হলে কীটনাশক ব্যবহার করা মাছের জন্য ঝুকিপূর্ণ হয়ে থাকে।
  • সহজে মাছ চুরি হয়ে যেতে পারে।
  • ধানক্ষেতে মাছ চাষে জমির মালিক ও বর্গাচাষীর মধ্যে সমঝোতার অভাব পরিলক্ষিত হয়।

 
 
তথ্যসূত্র: DoF, Bangladesh

#1

Please login or Register to Submit Answer