মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই

1 answer

মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা
মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন করতে হলে সরেজমিনে স্থান পরিদর্শন পূর্বক পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহন প্রয়োজন। নদী নিবাসী মাছের জন্য নদীতে এবং বিল নিবাসী মাছের জন্য বিলে অভয়াশ্রম স্থাপন করা উচিত। স্থানীয় জনগণ ও মৎস্যজীবীদের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে তাদের সাথে আলোচনাক্রমে অভয়াশ্রমের স্থান ও আকার ঠিক করা আবশ্যক। সাধারণত নদী অথবা অন্য কোন জলাশয়ের এমন অংশে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট মৌসুমে অথবা সারা বছর মাছ ধরা বন্ধ রাখা সম্ভব। নদ-নদী বা বিলের এমন কোন গভীর অংশ বা পকেট নির্বাচন করতে হবে যেখানে মাছের আনাগোনা বেশি, তুলনামূলক ভাবে স্রোত কম, পলি জমার সম্ভাবনা কম, নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে না এবং জনগণ দ্ধারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। জলাশয়ের কত ভাগ এলাকায় অভয়াশ্রম হবে তা সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা না গেলেও মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, শুষ্ক মৌসুমে সংশ্লিষ্ট জলাশয়ের আয়তনের শতকরা ৫০ ভাগ এলাকাকে অভয়াশ্রম হিসাবে রাখা যেতে পারে। তবে আয়তন নির্ধারণ কালে জলাশয় সংশ্লিষ্ট মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। প্লাবনভূমি ও বিল এলাকায় ৪০০-৫০০ বর্গমিটারের ডোবায় অভয়াশ্রম তৈরি করেও সুফল পাওয়া গেছে। অভয়াশ্রম স্থাপনের নিমিত্ত নির্বাচিত এলাকার সীমানা নির্ধারণ করে চারদিকে লাল পতাকা দিয়ে রাখতে হবে এবং এর ভিতরে কাঠা স্থাপন করতে হবে।
 
মৎস্য অভয়াশ্রমের ফলপ্রসু ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় সুফলভোগী জনগোষ্ঠী ও মৎস্যজীবীর মধ্য হতে অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যা পরবর্তীতে মৎস্য সমাজভিত্তিক সংগঠন (FCBO[1]) হিসাবে বিবেচিত হবে। অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের স্থায়ীত্বশীলতার লক্ষ্যে এ সংগঠনের একটি অনুমোদিত গঠনতন্ত্র থাকবে এবং সংগঠনটি সরকারের নিবন্ধন সংস্থা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে। সংগঠনের ও অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে অভয়াশ্রম নিকটস্থ স্থানে একটি কমিউনিটি-কাম-ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে। এ জন্য কিছু নিয়মনীতি নির্ধারণ করতে হবে। যেমন- লাল পতাকা চিহ্নিত সীমানা হতে ২০০ মিটার দূরে মাছ ধরা, বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত মাছ না ধরা, নির্দিষ্ট ফাঁসের জাল ব্যবহার, অভয়াশ্রমে পাহাড়াদার নিয়োগ, নিয়ম ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির সংগে যোগসূত্র স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসহ বিল বোর্ড স্থাপন। প্রয়োজনে কিছুদিন পর পর অভয়াশ্রম সংস্কার সাধন করতে হবে।
 
অভয়াশ্রমে দেশীয় জাতের ছোট মাছের পোনা মজুদকরণ
দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়সমূহে দেশীয় জাতের ছোট মাছের ক্রমহ্রাসমান অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধিকরণের লক্ষ্যে স্থাপিত অভয়াশ্রমে পর্যায়ক্রমে দেশীয় ছোট মাছের পোনা/মা মাছ মজুদ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অতিবিপন্ন ও সংকটাপন্ন ছোট মাছের প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদিত পোনা বা মা মাছ মৎস্য অভয়াশ্রমে অবমুক্ত কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। উল্লেখ্য যে, অনেক ছোট মাছ যেমন- কৈ, শিং, মাগুর, গুলশা, পাবদা, মেনি, বাটা, তারা বাইম ইত্যাদি মাছের প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন হচ্ছে।
 
অভয়াশ্রমের প্রভাব
অভয়াশ্রম সৃষ্টির ফলে অভয়াশ্রম এলাকায় প্রজননের জন্য প্রচুর প্রজননক্ষম মাছ এবং পোনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সমাহার ঘটে। এর প্রভাবে সংশ্লিষ্ট জলাশয়ের সংগে যুক্ত অন্যান্য অংশে এবং পার্শ্ববর্তী জলাশয়েও মাছের উৎপাদন এবং প্রাচুর্যতা বৃদ্ধি পায়। মৎস্য অধিদপ্তরের ৪র্থ মৎস্য প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত অভয়াশ্রমের মধ্য হতে ২৭টি জলাশয়ের সুফলভোগীদের নিকট হতে সংগৃহীত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় মাছের উৎপাদন পূর্বের তুলনায় শতকারা ১৫ থেকে ২০০ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অভয়াশ্রম স্থাপনের ২-৩ বছরের মধ্যে এসব জলাশয়ের মাছের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ১২০ কেজি হতে বৃদ্ধি পেয়ে ২৩৯.৪ কেজিতে ঊন্নীত হয়েছে। ২৭টি জলাশয়ের মধ্যে ২৩টি জলাশয়ে মাছের প্রজাতি সংখ্যা শতকরা ৮৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্থানীয় ভাবে বিলুপ্তপ্রায় ২৪টি প্রজাতির মাছের পুনঃআবির্ভাব ঘটেছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট জলাশয়গুলোতে পূর্বে খুবই কম পাওয়া যেত এমন বিপন্ন ২৩টি প্রজাতি মাছের প্রাচুযর্তা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বোপরি মৎস্যজীবীদের আয় বিভিন্ন জলাশয়ে বিভিন্ন হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, মাচ্ (MACH[2]) প্রকল্প ও নতুন জলমহাল নীতিমালাভুক্ত উন্মুক্ত ও বদ্ধ জলমহালে মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুরূপ ফলাফল পাওয়া গেছে।
 
আমাদের দেশে বর্তমানে বিদ্যমান মাছের প্রজাতিসহ জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার জন্য তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহন না করা হলে জলজ জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও মৎস্যজীবিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিপর্যয় ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টিহীনতা চরম আকার ধারণ করবে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হওয়া দরকার এবং মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, বিল, প্লাবনভূমি, উপকূলীয় অঞ্চলের উপযুক্ত স্থানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহনের মাধ্যমে অভয়াশ্রম স্থাপন করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধি, এনজিও, প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীগণ সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসলে সর্বসাধারণের মাঝে এ বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি হবে।
[1] Fisheries Community Based Organization.
[2] Management of Aquatic Resourses Through Community Husbandary.
 
 
তথ্যসূত্র: DoF, Bangaldesh

#1

Please login or Register to Submit Answer

Latest Q&A

Like our FaceBook Page to get updates



Are you satisfied to visit this site? If YES, Please SHARE with your friends

To get new Q&A alert in your inbox, please subscribe your email here

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner