থাই পাংগাস মাছের পোনা উৎপাদনে হ্যাচারী ও চাষ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাই

1 answer

১. থাই পাংগাসের পরিচিতি
থাই পাংগাস হচ্ছে মেকং নদীর ক্যাটফিস গোত্রভূক্ত একটি মাছ । এই গোত্রের ২ টি মাছ – Pangasianodon hypophthalmus (Vietnamese: Tra) and the Pangasianodon bocourti (Vietnamese: Basa) চাষ করা হয়ে থাকে ।
বাংলাদেশে থাই পাংগাস বর্তমানে একটি ব্যাপক চাষকৃত মাছের প্রজাতি। নব্বই দশকে থাইল্যান্ড হতে আনা পাংগাাসিয়াস সুচির কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ব্যাপক পোনা উৎপাদন করে পুকুরে চাষ করা হয়। বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জলাশয়ে এই মাছ চাষ করা হয় এবং দেশের মোট মোট মৎস্য উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে পাংগাস এর অবদান । বাংলাদেশে Pangasianodon hypophthalmus মাছটি চাষ করা হয় ।

২. থাই পাংগাসের পোনা উৎপাদনে হ্যাচারী ব্যবস্থাপনা
২.১    হ্যাচারীর স্থান নির্বাচন
থাই পাংগাসের পোনা উৎপাদন হ্যাচারীর স্থান নির্বাচনে নিম্নের বিষয়গুলো ভালভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন –

  • হ্যাচারীর স্থান বন্যা মুক্ত হতে হবে।
  • পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে (ভূ-গর্ভস্থ/উপরিভাগের পানির উৎস হতে পারে)।
  • পুকুরের মাটি বেলে-দোআঁশ হতে হবে।
  • হ্যাচারীর সাথে ভাল সড়ক যোগাযোগ থাকতে হবে।
  • স্থায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • পোনা বিক্রির জন্য ভাল বাজার বা বিপণনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

২.২ পাংগাস ব্রুডস্টকের যত্ন

  • উন্নতমানের পোনা তৈরীর জন্য প্রতিটি হ্যাচারীর স্বাস্থবান ও সতেজ ব্রুড ফিশ থাকতে হবে।
  • পাংগাসের সফল প্রজননের জন্য ব্রুডস্টকের সুব্যবস্থাপনা খুবই জরুরী
  • প্রজনন মৌসুমের কমপে  ৩-৪ মাস আগে স্বাস্থবান বয়ষ্ক মাছ নির্বাচন করে ব্রুড পুকুরে পালন করতে হবে।
  • ব্রুড পুকুরের আয়াতন সাধারনত ০.২-০.২৫ হেক্টর হয়ে থাকে। ব্রুড মাছের মজুদ ঘনত্ব ২০০০-২৫০০ কেজি/হেক্টর।
  • পুকুরের পানির গভীরতা ২-৩ মিটার।
  • পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য নিয়মিত চুন ও সার দিতে হবে।
  • ব্রুড মাছকে তাদের দেহের ওজনের ৩-৫% হারে ৩৫% প্রটিন সমৃদ্ধ খাদ্য দিতে হবে।
  • খাবারের অন্যান্য উপাদানের সাথে ১% হারে ভিটামিন ও মিনারেল মিশ্রন দিতে হবে।

২.৩ পাংগাস মাছের পরিপক্কতা

  • পাংগাস এশটি নদীর মাছ যা ৩ বৎসরে পরিপক্কতা লাভ করে।
  • তবে চাষের পুকুরে এটি ২ বৎসরে পরিপক্ক হয়।
  • ভাল মানের পোনা  পাওয়ার জন্য ৩-৫ কেজি ওজনের ব্রুড মাছ নির্বাচন করতে হবে।
  • পাংগাসের প্রজনন শুরু হয় এপ্রিল মাস থেকে এবং সেপ্টেম্বর-এর মাঝামাঝি চলে।
  • এটি ব্রুড মাছ  একপ্রজনন ঋতুতে কমপক্ষে ২ বার ব্যবহার করা যায়।

২.৪ প্রজননের জন্য স্ত্রী ও পুরুষ পাংগাস নির্বাচন

  • প্রজনন ঋতুতে আকার আকৃতি দেখে স্ত্রী ও পুরুষ সহজেই চেনা যায়।
  • স্ত্রী মাছের পেট থাকে বড় ও ফুলা, রং হয় লালচে গোলাপি ধরণের
  • পুরুষ মাছের লালচে জেনেটাল ওপেনিং থাকে এবং অল্প চাপ দিলেই সাদাটে শুক্রানু বের হয়।
  • পুরুষ মাছের পেক্টরাল পাখনার উপরের দিকে হয় খসখসে

২.৫ পাংগাসের কৃত্রিম প্রজনন

  • প্রজনন ঋতুতে পরিপক্ক মাছ পুকুর খেকে সংগ্রহ করতে হবে।
  • বিশ্রাম ও কন্ডিশনিং এর জন্য স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে পৃথক সি ষ্টার্নে ৬ ঘন্টা পানির ঝর্ণা দিয়ে রাখতে হবে। স্ত্রী মাছ পরিপক্ক হয়েছে কিনা তা ক্যাথেটার দিয়ে পরীা করে দেখা যেতে পারে ।
  • কন্ডিশনিং এর পরে স্ত্রী মাছকে পি.জি. ইনজেকশনের প্রথম ডোজটি (২ মিলিগ্রাম/ কেজি) দিতে হবে। পুরুষ মাছকে এই সম য়ে কোন ইনজেকশন দেওয়ার দরকার নেই। এর পর স্ত্রী মাছ কে সিষ্টার্নে ৬ ঘন্টার জন্য রেখে দিতে হবে। স্ত্রী ও পুরুষ মাছ কে পৃথক সিষ্টার্নে রাখতে হবে ।
  • ৬ ঘন্টা পর স্ত্রী মাছকে পি.জি. ইনজেকশনের দ্বিতীয় ডোজটি (৬ মিলিগ্রাম/কেজি) দিতে হবে । পুরুষ মাছকে এই সময়ে প্রথম ও একমাত্র ডোজটি (২ মিলিগ্রাম/কেজি) দিতে হবে ।

Dose used in Pangus breeding

  • স্ত্রী মাছ
    • ১-২ টি প্রাথমিক ইনজেকশন (৩০০-৫০০ IU এইচ. সি. জি. + ০.৫ মিলিগ্রাম পি.জি./কেজি)
    • শেষ ইনজেকশন (২৫০০-৩০০০ IU এইচ. সি. জি. + ৫-৭ মিলিগ্রাম পি.জি./কেজি)
    • দুইটি ইনজেকশনের মধ্যে সময় ৮-১২ ঘন্টা
  • পুরুষ মাছ
    • একমাত্র ডোজটি দিতে হবে স্ত্রী মাছের দ্বিতীয় ডোজটির সময় (৩০০ IU এইচ. সি. জি. + ০.৫ মিলিগ্রাম পি.জি. / কেজি)
  • স্ত্রী মাছকে দ্বিতীয় ইনজেকশন ও পুরুষ মাছকে প্রথম ও একমাত্র ইনজেকশন দেওয়ার পর স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে পৃথক সিষ্টার্নে পানির ঝর্ণা দিয়ে রাখতে হবে।
  • ৬-৭ ঘন্টার মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষ মাছের পেটে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ডিম ও শুক্রাণু সংগ্রহ করে একত্রে মিশিয়ে নিষেক সম্পন্ন করতে হবে ।
  • ভিয়েতনামে পরিপক্ক পুরুষ মাছ থেকে সিরিঞ্জের সাহায্যে ০.৯% ঘধঈষ দ্রবণে শুক্রাণু সংগ্রহ করে রেখে ডিম নিষিক্ত করা হয় ।
  • পাংগাসের নিষিক্ত ডিম খুবই আঠালো । নিষিক্ত ডিমের জিলাটিনাস আঠালো ভাব দূর করার জন্য অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলে ডিম নিয়ে গুঁড়া দুধের দ্রবণ দিয়ে ধুতে হবে । একাজে ‘তিলক মাটি’ নামে পরিচিত লাল কাদার দ্রবণও ব্যবহার করা যেতে পারে ।
  • ভিয়েতনামে পাংগাসের ডিমের আঠালো ভাব দূর করার জন্য, ডিমের সাথে পাখির পালকের সাহায্যে ট্যানিন (Tannin) ০.১% হারে মেশানো হয় । ৩০ সেকেন্ড পরে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় । ট্যানিনের বিকল্প হিসাবে আনারসের রসও ডিমের আঠালো ভাব দূর করার জন্য ব্যবহƒত হয়ে থাকে । ২৫ মিলি লিটার আনারসের রস পাখির পালকের সাহায্যে মিশিয়ে ১ মিনিট পরে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় ।
  • এর পর নিষিক্ত ডিমগুলিকে হ্যাচিং বোতল বা সার্কুলার ট্যাংকে ছাড়া হয় ।
  • ৩০-৪০ ঘন্টার মধ্যে ডিমের পরিস্ফুটন সম্পনড়ব হয় । কুসুমথলি নি:শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন পরিস্ফুটিত হ্যাচলিংগুলির (রেণু পোনা) বিশেষ যতড়ব নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষভাবে অক্সিজেন সরবরাহ ও পানির প্রবাহের দিকে খেয়াল রাখা উচিত ।
  • এ সময়ে হ্যাচিং বোতল বা সার্কুলার ট্যাংকে পানির বৈশিষ্টসমুহ সাবধানতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।

পাংগাসের হ্যাচারীতে পানির আদর্শ বৈশিষ্টসমূহ
পানির বৈশিষ্ট উপযোগী সীমা

  • তাপমাত্রা (oC) ২৮-৩০
  • pH ৬.৫-৯.০
  • অক্সিজেন (পি.পি.এম.) ২-৫
  • কার্বন-ডাই-অক্সাইড (পি.পি.এম.) ০-১০
  • সর্বমোট ক্ষারকত্ব (পি.পি.এম.) ৫০-৪০০
  • % কার্বনেট ০-৪০
  • % বাইকার্বনেট ৭৫-১০০
  • সর্বমোট খরতা (পি.পি.এম.) ৫০-৪০০
  • সর্বমোট লৌহ (পি.পি.এম.) ০.১৫-০.৫০
  • নাইট্রেট (পি.পি.এম.) ০.৬-৩.০
  • নাইট্রাইট (পি.পি.এম.) ০-০.৫
  • ফসফরাস (পি.পি.এম.) ০.০১-০.৩০
  • পটাসিয়াম (পি.পি.এম.) ০.৪-১.০
  • অ্যামোনিয়া (পি.পি.এম.) ০.০০-০.০৫
  • ক্যালসিয়াম (পি.পি.এম.) ১০-১৬০
  • ম্যাংগানিজ (পি.পি.এম.) ০.০০-০.০১
  • সিসা (পি.পি.এম.) ০.০
  • পারদ (পি.পি.এম.) ০.০
  • জিংক (পি.পি.এম.) ০.০০-০.০৫

সতর্কতা

  • ৩৬-৪২ ঘন্টার মধ্যে রেণু পোনার কুসুমথলি নি:শেষ হয়। প্রাথমিক খাবার হিসাবে তিন ঘন্টা পর পর মুরগির সিদ্ধ ডিমের কুসুম খাওয়াতে হবে।
  • দেখা গেছে কুসুমথলি নি:শেষ হওয়ার পরে বাইরের খাবার দিতে দেরী হলে রেণু পোনা একে অপরকে কামড়ানো শুরু করে এবং অনেক পোনা মারা যায়।
  • সুতরাং এই সময়ে নিযমিতভাবে পরিমানমত খাবার দেওয়া দরকার । হ্যাচিং বোতল বা সার্কুলার ট্যাংকে ১-২ দিন বাইরের খাবার দেওয়ার পর পোনা নার্সারী পুকুরে মজুদের ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. পাঙ্গাস মাছের উন্নত নার্সারী  ব্যবস্থাপনা
৩.১ পাঙ্গাস নার্সারীর উপযোগীতা

  • সুস্থ সবল পোনা অধিক মৎস্য উৎপাদন নিশ্চিত করে ।
  • চাহিদা মত ও সময় মত পোনা প্রাপ্তির জন্য ।
  • রেণু পোনার মৃত্যুর হার কমানোর জন্য ।
  • মৌসুমী জলাশয়ের সদব্যবহার ।

৩.২ নার্সারী ব্যবস্থাপনা
নার্সারী ব্যবস্থাপনাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় –  মজুদপূর্ব, মজুদকালীন ও মজুদপরবর্তী ।নার্সারী ব্যবস্থাপনার বিবেচ্য বিষয়গুলি নিম্নরুপ –

  • পুকুর নির্বাচন
  • পুকুর শুকানো
  • চুন প্রয়োগ
  • সার প্রয়োগ
  • কীট পতঙ্গ দমন
  • পোনা মজুদকরণ
  • পরিচর্যা
  • আহরণ
  • আগাছা পরিষ্কার ও রাুসে ও অবাঞ্চিত প্রাণী দূর করতে হবে ।

৩.৩ পাঙ্গাসের রেণু পোনা প্রতিপালন পদ্ধতি

  • এক ধাপ প্রতিপালন পদ্ধতি – ১৫-২০ গ্রাম রেণু/ শতাংশ
  • দুই ধাপ প্রতিপালন পদ্ধতি –  ৭৫- ১৫০ গ্রাম রেণু/ শতাংশ (১৫- ২০ দিনের মধ্যেই কাটাই করে ৪০০০-৫০০০ ধানী পোনা প্রতি শতাংশে দিতে হবে, ৩৫ – ৫০ দিনের মধ্যেই ২”- ৪” সাইজের পোনা পাওয়া যাবে।

৩.৪ নার্সারী পুকুর নির্বাচন

  • মৌসুমে অথবা সারা বছর পানি থাকে ।
  • আয়তনে ছোট ও আয়তাকার ।
  • আয়তনে ৩০-৫০ শতাংশ উত্তম
  • গভীরতা ৩-৪ ফুট ভাল ।
  • পানি সরবরাহ ও বের করার উত্তম ব্যবস্থা ।
  • পুকুর পাড়ে গাছ না থাকা উত্তম । গাছ থাকলে পাতা ঝরে পুকুরের পানি নষ্ট করে দেয় ।
  • সূর্যালোক না  পৌঁছলে প্রাকৃতিক খাবার জন্ম ব্যহত হবে।

৩.৫ পুকুর শুকানো

  • উত্তম এবং জরুরী ।
  • পাড় মেরামত ও তলার আগাছা পরিষ্কার করণ ।
  • রাুসে ও অবাঞ্ছিত প্রাণী নির্মুল ।
  • তিকারক পোকা মাকড়, পরজীবি রোদে শুকিয়ে মারা যাবে ।
  • তলার আবর্জনা রোদে শুকালে বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে ।

৩.৬ নার্সারী পুকুরের চারপাশে নেটের বেড়া স্থাপন
জলজ আগাছা পরিষ্কার ও রাুসে ও অবাঞ্ছিত প্রাণী নির্মুলের পর বাজারে প্রচলিত সস্তা মিহি ফাঁসের নাইলনের নেট দ্বারা পুকুরের চারপাশে পানির কিনার ঘেষে ২ ফুট উঁচু করে বেড়া দিলে তিকারক পোকামাকড়, সাপ, ব্যাং, কাঁকড়া, হাঁসপোকা ইত্যাদির হাত থেকে পোনামাছ রা পাবে এবং পোনামাছ বাঁচার হার বেড়ে যাবে।
৩.৭ পুকুের চুন প্রয়োগ

  • চুনের এমন গুন যেন ভাতের সাথে নুন ।
  • pH সমতা রাখে ।
  • পুকুরের প্রাথমিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও সক্রিয় করার জন্য চুন CO2 এর সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেট তৈরী করে যা পানিতে সালোকসংশ্লেষন প্রক্রিয়া চালু রাখে।
  • চুন পুকুরের তলদেশের জৈব ও বর্জ্য পদার্থকে পচাতে সাহায্য করে ফলে নাইট্রোজেনের পরিমান বেড়ে যায় যা মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনতে প্রভাবিত করে।
  • মাটির পুষ্টিকারক পদার্থ পানিতে মিশিয়ে মাছের খাবার তৈরীতে সাহায্য করে।
  • চুন প্রয়োগে তলদেশের পরজীবি ও তিকারক অনুজীব ধংস হয় ।
  • পানির ঘোলাত্ব দুরীকরণ ও পানি পরিশোধনের কাজ করে।

চুনের প্রকারভেদ ও প্রয়োগ মাত্রা
চুনের প্রধান উপাদান হলো ক্যালসিয়াম। বাজারে প্রচলিত চুন নিম্নরূপে পাওয়া যায়,  যেমন- পোড়া চুন (CaO), পাথুরে চুন (CaCO3), কলিচুন (Ca(OH)2), জিপসাম (CaSO4, 2H2O), ডলোমাইট (CaMg(CO3)2)। পুকুর শুকিয়ে বা পানিতে সাধারনত শতাংশে ১ কেজি হারে পাথর চুন দেওয়া হয় তবে চুনের প্রয়োগ মাত্রা pHএর উপর নির্ভরশীল, যেমন-
pH-এর মান    পাথুরে চুন (কেজি/শতাংশ)
৩ – ৫ এর মধ্যে    ১২
৫ – ৬ এর মধ্যে    ৮
৬ – ৭ এর মধ্যে    ৪

  • পানির pH ৭ এর কম হলে পাথুরে চুন এবং ডলোমাইট এবং pH ৭ এর বেশী হলে জিপসাম ব্যবহার করা ভাল। জিপসাম কাদাজনিত ঘোলাত্ব কমাতে অধিক ফলপ্রসূ।

৩.৮ পুকুের সার প্রয়োগ

  • পাকৃতিক খাদ্য (সবুজ রং phytoplankton আর বাদামী রং zooplankton-এর আধিক্য) উৎপাদনের জন্য পুকুরে জৈব ও অজৈব সার দিতে হবে।
  • জৈব সার – গোবর ৫-১০ কেজি/শতাংশ
  • অজৈব সার – ইউরিয়া ১০০ গ্রাম/শতাংশ ও টিএসপি ২০০ গ্রাম/শতাংশ

৩.৯ পাঙ্গাস নার্সারীতে চুন ও সার প্রয়োগের নিয়মাবলী
পরিমিত পরিমান চুন পানিতে ভিজিয়ে ছেঁকে নিয়ে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে এবং ভাল করে মই দিয়ে তলা সমান করে নিতে হবে। চুন প্রয়োগের ১ দিন পর পরিমিত পরিমান গোবর পানিতে গুলে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে । একই দিন পরিমিত পরিমান অজৈব সার পানিতে গুলে সমস্ত পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে । এসময় শতাংশ প্রতি ২০০ গ্রাম ভিজা খৈল ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩.১০ নার্সারী পুকুরে পানি ঢুকানো

  • পাঙ্গাস নার্সারীতে কোন অবস্থাতেই যেন রাুসে বা অবাঞ্ছিত মাছ না ঢুকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে
  • পানির গভীরতা ৩-৪  ফুেটর মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়।
  • সাধারন হিসাবে হ্যাচারীতে পাঙ্গাসের ড়িম দেখে পুকুরে পানি ঢুকাতে হয়। পুকরে খুব বেশী এবং বড় আকারের প্লাংক্টন (যেটা রেণুর জন্য তির কারন) যাতে না জন্মাতে পারে সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই পুকুরে পানি ঢুকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে ।

৩.১১ জলজ কীট পতঙ্গ দমন

  • চুন ও সার প্রয়োগের ফলে পুকুরে পাংক্টন সমৃদ্ধ হওয়ায় হাঁসপোকা ও ব্যাঙাচি জন্ম নিবে । এরা পোনা ও পুকুরের খাবার খেয়ে ফেলে ও পোনার লেজ কেটে ফেলে ।
  • রেণু ছাড়ার ১২-১৫ ঘন্টা আগেই হাঁসপোকা দমন করতেই হবে

হাঁসপোকা দমনের উপায়

  • ডিপটেরাক্স (দানাদার রাসায়নিক)  –  মাত্রা ০.৫-১ পিপিএম বা ২০ গ্রাম/শতাংশ/২-৩ ফুট পানির জন্য।
  • সুমিথিওন/ লিথিওন (তরল রাসায়নিক) – মাত্রা ১০ মিলি লিটার/শতাংশ/২-৩ ফুট পানির জন্য।
  • রাসায়নিক প্রয়োগের ১২-১৫ ঘন্টার মধ্যেই রেণু পোনা ছাড়া যাবে ।

৩.১২ রেণু মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা
বিবেচ্য বিষয়

  • রেণুর উৎস্য
  • উন্নত জাত নিশ্চিতকরন
  • অন্তঃপ্রজনন সমস্যা মুক্ত রেণু
  • রেণু পরিবহন
  • টেকসই করণ
  • রেণু ছাড়া

৩.১৩ পাঙ্গাসের রেণু মজুদের সময় করণীয়

  • সুমিথিয়ন প্রয়োগের ৪/৫ ঘন্টা পর শতাংশে ২০০ গ্রাম করে ময়দা পানিতে মিশিয়ে সারা পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। ডিম থেকে হ্যাচিং এর পর ৩৬-৪৪ ঘন্টার মধ্যে রেণুপোনা পুকুরে ছাড়তে হবে। এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে পাঙ্গাসের রেণু প্রথম খাবারের সময় হলেই যদি খাবার না পায় তবে একটা আরেকটাকে কামড়াতে থাকে। তাই কামড়ানো শুরু করার পূর্বেই পুকুরে ছাড়তে হবে।
  • রেণুপোনা অত্যন্ত কোমল তাই ছাড়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
  • পানির তাপমাত্রা ও অক্সিজেন বিবেচ্য বিষয়
  • সূর্যোদয়ের পর সকাল বেলা ও সূর্যাস্তের পর পোনা ছাড়া উত্তম
  • পলিব্যাগ চটের ব্যাগ থেকে বের করে পুকুরের পানিতে রাখতে হবে
  • তারপর আস্তে আস্তে মুখ খুলতে হবে
  • ব্যাগের ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা সমতার জন্য আস্তে আস্তে পুকুরের পানি ব্যাগে দিতে হবে। আর তাপমাত্রা পরীা করতে হবে।
  • তাপমাত্রা সমতায় এলে ব্যাগ কাত করে ধরলে পোনা আপনা আপনিই পুকুরের দিকে যাবে।সারা পুকুরে রেণুপোনা ছড়িয়ে দেওয়াই ভালো।

৩.১৪ রেণু মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা
রেণুর খাবার

  • রেণূ ছাড়ার ১ ঘন্টা পর শতাংশে ১০০ গ্রাম ময়দা + ১০০ গ্রাম গুড়োদুধ + ৫টি স্যালাইন পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিতে হবে।
  • ১-৩ দিন – শতাংশে ১০০ গ্রাম ময়দা +১০০ গ্রাম গুড়োদুধ + ১ টি  সিদ্ধ ডিমের কুসুম পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিতে হবে (৮ ঘন্টা পরপর)। প্রতিবার খাবার দেয়ার সময় গামছা বা হাপা দিয়ে রেণু চেক করতে হবে।
  • ৪-৫ দিন থেকে ৭৫% ময়দা + ২৫% ভুট্টার বেসন (১০০% দৈহিক ওজন) এর  সাথে (প্রতি কেজি খাবারে ৮টি সিদ্ধ ডিম + ৩ টি রেনামাইসিন ক্যাপসুল) সকাল ও বিকালে সমপরিমান প্রয়োগ করতে হবে।
  • ১০-১৫ দিন থেকে ৪০-৪৫% প্রোটিন সমৃদ্ধ পিলেট খাবার খৈলের পানিতে ভিজিয়ে (২০০% দৈহিক ওজন) সকাল ও বিকালে সমপরিমান প্রয়োগ করতে হবে।
  • ১৫-২০ দিন থেকে ৪০-৪৫% প্রোটিন সমৃদ্ধ  পিলেট খাবার (৩০০% দৈহিক ওজন) সকাল ও বিকালে সমপরিমান প্রয়োগ করতে হবে।
  • ২০ দিনের মধ্যেই পোনা কাটাই করে অন্য পুকুরে দিতে হবে। ঐ পুকুরটিও ভালভাবে তৈরী করে নিতে হবে।
  • রেণুপোনা কাটাই করে অন্য পুকুরে স্থানান্তরের পর থেকে-
    • ১ম সপ্তাহে দৈহিক ওজনের ৩৫-৩০%
    • ২য় সপ্তাহে দৈহিক ওজনের ২৫-২০%
    • ৩য় সপ্তাহে দৈহিক ওজনের ১৫-১০%
    • এভাবে চলবে———

৩.১৫ রেণুপোনার পরিচর্যা

  • পানিতে খাবার ও সার দেওয়ায় ফলে পাড়ে ঘাস জন্মে, এগুলিপরিষ্কার করতে হবে ।
  • ব্যাঙ, সাপ, গুইসাপ প্রবেশে বাধা দেয়া ।
  • অক্সিজেন কমে মাছ ভেসে উঠলে জলচর পাখি থেকে পোনা রা করা ।
  • কোন ময়লা না ফেলা ।
  • পুকুরে খাবার দেযার পর অবশিষ্টাংশ পরীা করে খাবার কমানো-বাড়ানো ।
  • অধিক প্লাক্টন ব্লুম হলে খাবার বন্ধ ও পানির  আয়তন বাড়াতে হবে।
  • পোনা ছাড়ার ০৭ দিন পর থেকে সূর্য উঠার পর ও বিকালে ১-২ বার হরা  টানা । এর ফলে তলার দুষিত গ্যাস বের হয়ে যাবে ও শ্যাওলা জন্ম নিতে পারবেনা ।
  • ১ কেজি রেণু থেকে  ৪- ৫ লাখ পাংগাসের পোনা পাওয়া যায় তবে এটি নির্ভর করে রেণু পোনা মাপের উপর ও সঠিক ব্যবস্থাপনার উপর ।

৪. পাংগাস মাছ উৎপাদনে খামারের মাটি ও পানির ব্যবস্থাপনা
৪.১ পাংগাস পুকুরে পানির ও মাটি গুণাগুণ সঠিক মাত্রায় না হলে অসুবিধা সমূহ

  • মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদিত হবে না
  • বাহির থেকে দেওয়া খাদ্যের অপচয় হবে
  • মাছের বৃদ্ধি আশানুরুপ হবে না
  • মাছ রোগ বালাই-এ আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে
  • মাছের উৎপাদন কম হবে
  • কোন জলাশয়ের পানি ধারণের আধার হলো মাটি। জলাশয়ের উৎপাদন মতা প্রাথমিকভাবে মাটির ধরণের ওপর নির্ভর করে।
  • লাভজনকভাবে মাছ চাষের জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জলজ পরিবেশ এবং পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমিত সংস্থান।

৪.২ পাংগাস পুকুরের তলদেশের মাটি

  • পুকুরের তলার মাটি ও কৃষি কাজে ব্যবহৃত জমির মাটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পুকুরের মাটি সর্বদা পানির নীচে থাকে বলে এতে বায়ু কম থাকে কিন্তু সাধারণত চাষের জমিতে বায়ু বেশী থাকে ।
  • পুকুরে জলজ প্রাণী, শৈবাল ও উদ্ভিদ মারা যাওয়ার পর পুকুরের তলায় সঞ্চিত হয়। সে জন্য জৈব পদার্থের পরিমান কৃষি কাজে ব্যবহৃত মাটি অপো বেশী থাকে।
  • পুকুরের তলার মাটিকে পুষ্টি উপাদানের ভান্ডার বলা হয়। বিয়োজন কার্যের ফলে  মাটির পুষ্টি উপাদান জলে স্থানান্তরিত হয় ও পুকুরের উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। এই জন্য পুকুরের তলার মাটিকে পুকুরের রান্নাঘর হিসাবে আখ্যা   দেয়া হয়।
  • পুকুরের পানির রাসায়নিক গুণাগুণ তলদেশের মাটির গুণাগুনের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল ।
  • উর্বর মাটিতে খনন করা পুকুরে সাধারণভাবে মাছের উৎপাদনও ভাল হয়। উর্বর মাটি পানিতে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যের যোগান দেয় এবং পানি দূষণ রোধে ভূমিকা রাখে।
  • সাধারণভাবে মাটি ৪ প্রকারের হয়ে থাকে-এঁটেল মাটি, বেলে মাটি, লাল মাটি এবং দো-আঁশ মাটি। দোআঁশ মাটির পুকুর মাছচাষের জন্য সর্বাধিক উপযোগী। বেলে মাটির পানি-ধারণ মতা খুবই কম এবং লাল মাটির পুকুরে পানি প্রায় সব সময় ঘোলা থাকে। এজন্য বেলে মাটি ও লাল মাটিতে খনন করা পুকুর মাছচাষের জন্য ততটা উপযোগী হয় না।
  • পানি-ধারণ মতা এবং বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি ধরে রাখা ও আদান প্রদানে দোআঁশ মাটি উত্তম। দোআঁশ মাটিতে খনন করা পুকুর মাছ চাষের জন্য ভাল।
  • যে অঞ্চলের মাটিতে ভাল ফসল উৎপন্ন হয় সে অঞ্চলে খনন করা পুকুরে মাছের উৎপাদনও সাধারণত: ভাল হয়।
  • পুকুরের তলদেশের মাটি অম্ল হলে পুকুরের পানিও অ¤ হয়। মাটিতে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকারকের অভাব হলে পুকুরের পানিতেও পুষ্টি উপাদানের অভাব থাকে।
  • পুকুরের তলায় যদি ৬”-এর বেশী কাঁদা থাকে তবে বিভিন্ন ধরনের পচা (মিথেন জাতীয়) গ্যাস উৎপন্ন হয় যা পানির গুণাগুণ নষ্ট করে এবং মাছের বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। তাই অতিরিক্ত কাদা অপসারণ করতে হবে।

৪.৩ পাংগাস পুকুরের গভীরতা

  • পাংগাস পুকুরের গভীরতা কম হলে পানি গরম হতে পারে এবং তলদেশে তিকর উদ্ভিদ জন্মাতে পারে।
  • পুকুরে পানির গভীরতা বেশি হলে তলদেশে তাপমাত্রা কম থাকে এবং অক্সিজেনের অভাব ঘটে এবং তলদেশে তিকর গ্যাস সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় দূষণ এড়াতে তলদেশের মাছ অন্যান্য প্রাণী পানির উপরিভাগে চলে আসে। এতে পানির স্তর কমে যায় ও মাছের উৎপাদন ব্যাহত হয়।
  • পুকুরের গভীরতা ১ মিটারের কম বা ৫ মিটারের বেশী হওয়া উচিত নয়, সবচেয়ে ভাল গভীরতা হলো ২মিটার।
  • এ দেশের পুকুরগুলি বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল, তাই পুকুরের গভীরতা এমন হওয়া উচিত যাতে চৈত্র-বৈশাখ মাসেও পুকুরে যথেষ্ট পানি থাকে। পাংগাস চাষের জন্য ৫-৭ ফুট গভীর পুকুরই বেশি উপযোগী। বেশি গভীর পুকুরে তলা পর্যন্ত আলো পৌছাতে পারে না, ফলে পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন কম হয় ।

৪.৪ আলো

  • পুকুরের পানিতে দৈনিক অন্তত পে ৮ ঘন্টা সূর্যের আলো থাকা দরকার। পুকুরে সারাদিন সমগ্র পানি এলাকা, বেশী গভীর পর্যন্ত আলো প্রবেশের উপর পুকুরের প্রাথমিক বা উদ্ভিদ পাংক্টনের উৎপাদন নির্ভর করে।
  • পুকুরের পানিতে আলোর প্রবেশ বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যেমন-ক) পুকুরের পাড়ের গাছপালা, খ) পানির ঘোলাত্ব, গ) জলজ আগাছা, ঘ) মেঘলা আকাশ ইত্যাদি।
  • তাপমাত্রা বাড়লে মাছের খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যায়। মাছের বৃদ্ধি দ্রুততর হয়। তাপমাত্রা কমে গেলে মাছের খাদ্য গ্রহণের হার কমে যায়। এজন্য শীতকালে পুকুরে সার ও খাদ্যের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিতে হয়।

৪.৫ পুকুরের পানির তাপমাত্রা

  • মাছের দেহের তাপমাত্রা পানির তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল। পানির তাপমাত্রা ১০ সে. বৃদ্ধি পেলে মাছের খাদ্য গ্রহণের হার শতকরা ১০ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
  • মাছের বৃদ্ধি ও অন্যান্য জৈবিক কার্যকলাপ পানির তাপমাত্রা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এ দেশে মাছ চাষে তাপমাত্রাজনিত মারাত্মক কোন সমস্যা হয় না এবং সারা বৎসরই মাছের বৃদ্ধি হয়ে থাকে। শুধুমাত্র গ্রীষ্ককালে অগভীর ঘোলা জলাশয়ে অধিক তাপমাত্রার কারণে অক্সিজেনের অভাব ঘটে মাছ মারা যেতে পারে।
  • পুকুরে পানির পরিমাণ কম হলে পুকুরে কিছু এলাকা জুড়ে ভাসমান জলজ আগাছা (কচুরিপানা, কেশর দাম ইত্যাদি) রাখা প্রয়োজন । এতে পানির তাপমাত্রা খুব বেশী বৃদ্ধি পায় না এবং মাছ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

৪.৬ পুকুরের পানির ঘোলাত্ব

  • সকল জলাশয়ই কম বেশী ঘোলা। কিন্তু ঘোলাত্ব চোখে দৃষ্টিগোচর হওয়ার মত যথেষ্ট না হলে আমরা ঘোলা বলি না। ঘোলাত্বের মাত্রা তলদেশের মাটির প্রকার, গড়িয়ে পড়া পানির পরিমাণ, জৈব পদার্থের পচনের পরিমাণ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর নির্ভরশীল।
  • উদ্ভিদ পাংক্টনের কারণেও পানি ঘোলা হয় কিন্তু এই ঘোলাত্বে মাছের উৎপাদনকে বৃদ্ধি করে থাকে। আবার উদ্ভিদ পাংটনের জন্য অত্যাধিক ঘোলা হলে পানি দূষিত হয়ে অক্সিজেনের অভাবে মাছ মারা যেতে পারে।
  • পানি ঘোলা হলে তাপমাত্রা বেশী বৃদ্ধি পায়, ফলে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায় এবং মাটির সূকণা মাছের ফুলকায় আটকিয়ে মাছ শ্বাস কষ্টে মারা যায়।

৪.৭ ঘোলাত্ব দমন করার উপায়

  • সুক্ষ্ণ মাটিকণা দ্বারা সৃষ্ট ঘোলাত্ব চুন, জিপসাম ও ফিটকারী ব্যবহার করে দূর করা যায়।
  • পানির গড় গভীরতা ৫ ফুট হলে একর প্রতি ৪০ থেকে ৬০ কেজি ফিটকারী পানিতে গুলে সমগ্র পুকুরে ছড়িয়ে দিতে হবে । পানির গড় গভীরতা ৩ ফুট হলে উপরের অর্ধেক করতে হবে। প্রথমে নিম্ন মাত্রা ব্যবহার করতে হবে, তাতে কাজ না হলে ৫ থেকে ১০ কেজি বৃদ্ধি করে ব্যবহার করতে হবে।
  • একর প্রতি কৃষিজ জিপসাম ১৫০ থেকে ২০০ কেজি সমগ্র পুকুরে ছড়ায়ে দিতে হবে ।
  • একর প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ কেজি চুন পানিতে গুলে সমগ্র পুকুরে ছড়ায়ে দিতে হবে।

৪.৮ পুকুরের পানির পিএইচ

  • পুকুরের পানি ও মাটির পিএইচ এর রেঞ্জ ৬.৫ থেকে ৯.০ হলে মাছ চাষ করা সুবিধাজনক।
  • পানিতে পিএইচ যদি ৯.৫ এর উপর হলে মুক্ত কার্বনডাইঅক্সাইড পাওয়া যায় না, ফলে প্রাথমিক উৎপাদন হতে পারে না বললেই চলে।
  • পিএইচ যদি ১০-১১ হয় তাহলে মাছ ারত্ব বেড়ে যায় এবং মাছ মারা যায়। পান্তরে কম পিএইচ এর অম্ল পানি মাছ চাষের জন্য ভাল নয়, কারণ এতে মাছের ক্ষুধা হ্রাস পায়, বৃদ্ধি কমে যায় এবং বিষাক্ত পদার্থের সহ্য মতা কমে যায়। পিএইচ  হ্রাস পেলে হাইড্রোজেন সালফাইড ও অন্যান্য ভারী ধাতব পদার্থের বিষাক্ততা বৃদ্ধি পায়।
  • অম্ল মাছ সহজেই বিভিন্ন রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়।
  • পানি অম্ল হলে পুকুরে চুন দেওয়া উচিত। পুকুরে পোনা ছাড়ার আগে পুকুর শুকিয়ে তলদেশে চুন ছিটিয়ে দিতে হয়।

৪.৯ অ্যামোনিয়া

  • জৈব পদার্থ, উচ্ছিষ্ট খাবার ইত্যাদি পচনের ফলে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে পুকুরের পানিতে অ্যামোনিয়ার সৃষ্টি হয়। যা পানির স্বাভাবিক গুণাগুন নষ্ট করে । এ ছাড়া সার প্রয়োগ, মাছের মল ও প্রাণীর রেচনের কারণেও পানিতে অ্যামোনিয়া সৃষ্টি হয়।
  • পানিতে অ্যামোনিয়ার পরিমান বৃদ্ধি পেলে সেই পানিকে দুষিত বলা হয। পানিতে ইহা যৌগ রুপে (NH3) ও মূলক রুপে (NH4) থাকে।  যৌগ রুপে অ্যামোনিয়া মাছের জন্য বেশী তিকর কিন্তু মূলক অ্যামোনিয়া অপোকৃত কম তিকর ।
  • মাছের রক্তের মধ্যে তিকারক অ্যামোনিয়ার পরিমান বেড়ে গেলে রক্তের হিমোগ্লোবিন এর ফেরাস আয়ন সহজেই ফেরিক আয়নে রূপান্তরিত হয়, এতে মাছের মৃত্যু হয়।
  • পানিতে অ্যামোনিয়ার পরিমান ০.৪০ থেকে ৩.০ পিপিএম হলে মাছের দ্রুত মৃত্যু ঘটে।

৪.১০ পুকুরে পানিতে অ্যামোনিয়ার পরিমান বৃদ্ধি পেলে করনীয়

  • দ্রুত পানি পরিবর্তন করতে হবে ।
  • জিওলাইট প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • মাছের ঘনত্ব  হ্রাস করতে হবে ।
  • খাদ্য প্রয়োগ কমিয়ে দিতে হবে ।

৪.১১ হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S)

  • পুকুরের তলদেশের পরিবেশ খারাপ হলে এবং পচা বর্জ্য জমা হলে পানিতে অক্সিজেনের পরিমান কমে যায় এবং হাইড্রোজেন সালফাইড (ঐ২ঝ) গ্যাসের সৃষ্টি হয়।
  • হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S) গ্যাস মাছের স্বাস্থ্যের জন্য তিকর। এই গ্যাস মাছের ফুলকা, পিত্ত ও যকৃত নষ্ট করে দেয়। মাছের খাবার গ্রহণ প্রবণাতা হ্রাস পায়।
  • পুকুরে হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S) এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা <০.০০২ পিপিএম।
  • পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইডের মাত্রা বেড়ে গেলে অক্সিজেনের পরিমান বাড়াতে হবে
  • মাছকে নিয়মমাফিক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে । এ অবস্থায় জিওলাইট প্রয়োগ করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়।

৪.১২ পুকুরে পানিতে পুষ্টিকারক পদার্থ

  • পানিতে দ্রবীভূত পুষ্টিকারকের পরিমাণের উপর মাছের উৎপাদন বিশেষভাবে নির্ভর করে। পুস্টির অভাবে মাছের উৎপাদন ভাল হয় না। পুকুরে সাধারণত: নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের অভাব  দেখা দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফসফরাসের অভাব বেশী ঘটে থাকে।
  • মাটিতে পরিমিত জৈব পদার্থের উপস্থিতিই সহজপ্রাপ্য ফসফরাসের সরবরাহ অব্যাহত রাখে। মাছচাষের জন্য প্রতি ১০০ গ্রাম মাটিতে ১০-২৫ মিলিগ্রাম হারে সহজপ্রাপ্য ফসফেট থাকা প্রয়োজন।
  • বায়ুমন্ডলের নাইট্রোজেনই মাটির নাইট্রোজেনের প্রধান উৎস। ১০০ গ্রাম মাটিতে ৮-১০ মিলিগ্রাম হারে সহজপ্রাপ্য নাইট্রোজেন থাকা দরকার।
  • জৈব পর্দাথ পুকুরের তলার মাটিকে সজীব ও সক্রিয় রাখে এবং পানি চুয়ানো বন্ধ করে মাটির পানি ধারণ মতা বৃদ্ধি করে। এই জৈব পর্দাথ ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের প্রধান উৎস।
  • জলজ পরিবেশে জৈব পদার্থ আবহাওয়া থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন ধারণ করে। আবার অতিরিক্ত মাত্রায় জৈব পদার্থ পানির পিএইচ কমিয়ে দিয়ে পানি দূষিত করে।
  • ডুবন্ত কণার কারণে পানি ঘোলা হলে জৈব পদার্থ প্রয়োগে তা দুর করা যায়।
  • পুকুর বা জলাশয়ের মাটিতে সাধারণতভাবে শতকরা ১.০-২.০ ভাগ জৈব কার্বন থাকলে পানির উৎপাদন মতা বৃদ্ধি পায়।
  • পুকুরে পানির পুষ্টিকারক প্রধাণত: তলদেশের মাটি থেকে আসে, তা ছাড়া বাতাস, পানিতে দ্রবীভূত ও দানাদার জৈব পদার্থ, বাহির থেকে প্রয়োগকৃত সার (অজৈব ও জৈব) ইত্যাদি পুষ্টিকারকের উৎস।
  • প্রায় সকল পুকুরেই ফসফরাস বা নাইট্রোজেন পুস্টিকারকের অভাব থাকার কারণে টিএসপি ও ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
  • সার প্রয়োগের মাধ্যমে পুকুরে মাছের উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

৫. পাংগাস মাছের পরিবেশ বান্ধব উন্নত মিশ্র চাষ
পাংগাস মাছ একক বা মিশ্র পদ্ধতিতে পুকুরে চাষ করা যায়। তবে খামার পর্যায়ে পাঙ্গাস এর মিশ্র চাষই বেশী প্রচলিত। যেহেতু পাংগাস পুকুরের তলদেশের খাবার খায় তাই কার্প জাতীয় মাছের সাথে  মিশ্রপদ্ধতিতে এ মাছটি চাষ করা অধিক লাভজনক। মিশ্রপদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো পুকুরে সব স্তরের খাবারের সূষম ব্যবহারের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা । পাংগাস মাছ অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায় এবং দৈহিক বৃদ্ধির হার রুই জাতীয় মাছের চেয়ে বেশী হয় বলে এদের উৎপাদন অনেক বেশী । প্রতিকুল পরিবেশ (কম অক্সিজেন, পিএইচ, ঘোলাত্বের তারতম্য ইত্যাদি) পাংগাস মাছ বাঁচতে পারে । রাুসে নয় বলে রুই জাতীয় মাছের সাথে মিশ্র চাষ করা যায় এবং সর্বভূক বিধায় সম্পুরক খাদ্য প্রয়োগে চাষ করা যায়। স্বল্প থেকে মধ্যম লবনাক্ত পানি (২-১০ পিপিটি), ঘের ও খাঁচা এবং অন্যান্য মৌসুমী জলাশয়ে পাংগাস চাষ করা যায় ।
৫.১ পাঙ্গাস মাছের পুকুর প্রস্তুতি

  • ৫০-১০০ শতাংশ আয়তন বিশিষ্ট ও ৩-৫ ফুট পানির গভীরতা সম্পন্ন পুকুর পাঙ্গাস চাষের জন্য উপযোগী।
  • পুরাতন পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হবে এবং রাুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ দূর করতে হবে।
  • পুকুরের মাটি ও পানির অবস্থান ভেদে চূন প্রয়োগের মাত্রার তারতম্য ঘটতে পারে। পানির পিএইচ ৮.৫ এর নীচে হলে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে।

৫.২ পোনা মজুদ
মিশ্রচাষের সফলতা নির্ভর করে প্রজাতি নির্বাচনের ওপর। প্রজাতি নির্বাচনের েেত্র নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচ্য –

  • দ্রুত বর্ধনশীল উন্নত জাতের অন্তঃপ্রজনন সমস্যা মুক্ত পোনা
  • বাজারে যে সব প্রজাতির মাছের চাহিদা ও দাম বেশি
  • বাংলাদেশের পরিবেশে যে সব প্রজাতির দৈহিক বৃদ্ধির হার বেশি
  • অধিক ঘনত্বে যে সব প্রজাতির স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার ও বাঁচার হার বেশি
  • যে সব প্রজাতির পোনা সহজে পাওয়া যায়
  • যে সব প্রজাতি কম প্রোটিনযুক্ত খাদ্যে স্বাভাবিকভাবে বাড়ে
  • যে সব প্রজাতি সহজে রোগে আক্রান্ত হয় না
  • পাংগাস মাছের মিশ্রচাষে সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া গেছে এমন প্রজাতিগুলো হলো -রুই, সিলভার কার্প ও মনোসেক্স তেলাপিয়া

৫.৩ পোনা মজুদের হার
ভাল উৎপাদন পাওয়ার জন্য সুস্থ ও সবল পোনা নির্দিষ্ট হারে মজুদ করা উচিত । পুকুরে কতটি পোনা ছাড়তে হবে তা পুকুরের আকার আয়তনের ওপর নির্ভর করবে । অধিক মজুদ ঘনত্ব পরিহার করতে হবে। পাংগাসের একক চাষে উন্নত জাতের ১০-১৫ সে.মি. আকারের উন্নতমানের পোনা শতাংশে ১০০-১২০ টি হারে মজুদ করতে হবে । পোনা প্রাপ্তির ওপর পোনা মজুদের সময় নির্ভর করে। তবে মার্চ থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাছ দ্রুত বাড়ে বিধায় পোনা মার্চ মাসের মধ্যেই মজুদ করতে পারলে ভাল হয়। মিশ্রচাষের জন্য পোনা মজুদের সংখ্যা নিম্নে দেয়া হলো –

pungus stocking density

* ভিয়েতনামে নিবিড় পদ্ধতিতে পানির গভীরতা থাকে ৬-৭ ফুট । প্রতিদিন পানি পরিবর্তনের হার ২০-৩০% (জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে)। সর্বদায় উচ্চমানের ভাসমান খাবার (২৬-৩০% প্রোটিন) ব্যবহার করা হয় যার খাদ্য রূপান্তর হার (FCR) ১ : ১.১৬ – ১.৭।

৫.৪ খাদ্য প্রয়োগ ও মাত্রা

  • মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশপাশি সম্পূরক খাবার সরবরাহ করতে হবে ।
  • গুনগত মানসম্পন্ন্ খাদ্য প্রদানের ওপরই পাঙ্গাসের বৃদ্ধির হার প্রত্যভাবে নির্ভরশীল ।
  • খাদ্যে গুনগত মানসম্পন্ন উপাদান ব্যবহার করতে হবে এবং প্রোটিনের পরিমান ২৮-৩২% নিশ্চিত করতে হবে।
  • মজুদকৃত মাছের বয়স ও দৈহিক ওজনের সঠিক হারে খাদ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অতিমাত্রায় খাদ্য ব্যবহার পরিহার করতে হবে।
  • মাছ ছাড়ার পরের দিন থেকে মজুদকৃত মাছের প্রথম দিকে ১০ -১৫% হারে ও পরে মাসে মাসে ২ – ৩% কমিয়ে হারে প্রতিদিন সকালে (৫০%) ও বিকালে (৫০%) খাবার দিতে হবে।
  • মাছ মজুদের পর প্রতি ১৫ দিনে একবার জাল টেনে মাছের নমুনায়নের মাধ্যমে গড় ওজন জেনে খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে

৫.৫ ব্যবস্থাপনা/পরিচর্যা

  • পুকুরের আগাছা সর্বদা পরিস্কার রাখতে হবে
  • পুকুরের পানি দ্রুত কমে গেলে অন্য কোন উৎস হতে পানি দিয়ে ভরে দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে অথবা পানি বেড়ে গিয়ে উপচে পড়ার সম্ভাবনা থাকলে অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে।
  • পানির স্বচ্ছতা ৮ সেন্টিমিটারের নিচে নেমে গেলে সার ও খাবার দেয়া বন্ধ রাখতে হবে ।
  • পানিতে অক্সিজেনের অভাব হলে মাছ পানির উপরে উঠে খাবি খেতে থাকে। এ অবস্থায় পানিতে লাঠি পেটা করে বা সাঁতার কেটে ঢেউ সৃষ্টি করে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
  • মাঝে মাঝে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীা করতে হবে ।
  • মাঝে মাঝে হররা টেনে পুকুরের তলায় বিষাক্ত গ্যাস দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে ।
  • যে মাছগুলো বিক্রি বা খাওয়ার উপযোগী হয়ে যাবে সেগুলো ধরে ফেলতে হবে। তাহলে ছোট আকারের মাছগুলো বাড়ার সুযোগ পাবে ।

৫.৬ মাছ আহরণ

  • মাছ চাষের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো অল্প সময়ের মধ্যে বিক্রিযোগ্য মাছ উৎপাদন করা।  উলেখিত পদ্ধতিতে ৮-১০ মাস চাষ করলে মাছ গড়ে ১.৫-২.৫ কেজি ওজনের হয়ে থাকে এবং বিক্রি যোগ্য হয়।
  • মাছ ধরার জন্য টানা বেড়জাল ব্যবহার করা যেতে পারে। বাজারে বিক্রয় করতে হলে খুব ভোরে মাছ ধরার কাজ শুরু করা উচিত।
  • উপরোক্ত পদ্ধতিতে মাছের মিশ্রচাষ করে হেক্টর প্রতি বছরে ২৫-৩০ টন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে ।

৫.৭ পাংগাস চাষে বিরাজমান সমস্যাসমূহ

  • মৎস্য খাদ্যের পুষ্টিমান হ্রাস পাওয়ায় উৎপানের হার ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে।
  • খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারনে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • অতিমাত্রায় মজুদ ও অধিক খাদ্য ব্যবহারের কারনে পানি দুষনের ফলে মাছে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
  • স্বাদ কমে যাওয়ার কারনে পাংগাসের বাজারমুল্য অন্যান্য মাছের চেয়ে তুলনামুলকভাবে কম ।
  • চাষ পদ্ধতির ত্রু টির কারনে পাংগাসের গ্রহনযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে ফলে পাংগাসের চাষ সামগ্রিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়েছে।

সমস্যাদির কারণ

  • অধিক ঘনত্বে (শতাংশে ২০০-৩৫০টি) পোনা মজুদের ফলে কাংখিত মাত্রার উৎপাদন ব্যাহত।
  • অধিক ঘনত্ব ও অধিক খাদ্য প্রয়োগের ফলে পানির গুনাগুন নষ্ট ও রোগের প্রাদুর্ভাব।
  • পুষ্টি চাহিদা অনুযায়ী বানিজ্যিক পাংগাসের খাদ্যে প্রয়োজনীয় ২৮-৩২% প্রোটিনের স্থলে অধিকাংশ খাদ্যে ১৫-১৮% প্রোটিন ব্যবহার । খাদ্য পরিবর্তন হার (এফসিআর) ১.৮ থেকে ২.৫ তে বৃদ্ধি।
  • অন্ত:প্রজনন সমস্যার কারণে জাতের অবয়, খাদ্যে নিম্নমান ও ভেজাল মিশ্রিত উপাদান (ফিশমিল, মিট এন্ড বোনমিল, চালের কুড়া, সরিষার খৈল, আটা, ভিটামিন, ইত্যাদি) ব্যবহার, উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুন বৃদ্ধি।
  • বছরের পর বছর একই পুকুরে কালো কাদা অপসারণ না করে পোনা মজুদ, পুকুরের পানি দূষন।
  • অব্যবহৃত খাদ্য, মাছের জৈবিক বর্জ্য ও তলদেশের সঞ্চিত কালো কাদা পচনের ফলে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি, অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের বিষাক্ততা, মাছের মড়ক।

সমস্যা নিরসনে পরামর্শ

  • অধিক মজুদ ঘনত্ব পরিহার করতে হবে। পাংগাসের একক চাষে উন্নত জাতের ১০-১৫ সে.মি. আকারের উন্নতমানের পোনা শতাংশে ১০০-১২০ টি হারে মজুদ করতে হবে ।
  • পাংগাসের সাথে কার্প জাতীয় মাছের মিশ্রচাষ অধিক লাভজনক বিধায় মিশ্রচাষে প্রতি শতাংশে ৫০-৬০ টি পাংগাস, ৮-১০ টি রুই, ১২-১৫ টি  সিলভার কার্প ও ৩০-৩৫ টি মনোসেক্স তেলাপিয়া মজুদ করলে ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে।
  • খাদ্যে গুনগত মানসম্পন্ন উপাদান ব্যবহার করতে হবে এবং প্রোটিনের পরিমান ২৮-৩২% নিশ্চিত করতে হবে।
  • মজুদকৃত মাছের বয়স ও দৈহিক ওজনের সঠিক হারে খাদ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অতিমাত্রায় খাদ্য ব্যবহার পরিহার করতে হবে।
  • পানির গুনাগুন রার জন্য প্রতি মাসে সঠিক মাত্রায় চুন/জিওলাইট ব্যবহার করতে হবে।
  • মৌলিক রোগ প্রতিরোধ কৌশল অবলম্বন (জীবানু উচ্ছেদ, বাহিরের জীবানুর প্রবেশ রোধ, উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ মতা বাড়ানো ও রোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং নিয়মিত খামার পরিচর্যা) নিশ্চিত করতে হবে।
  • মাছ কোন কারণে রোগাক্রান্ত হয়ে গেলে সাথে সাথে মৎস্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
  • পুকুরে ২য় ফসলের সময় পোনা মজুদের পূর্বে অবশ্যই পুকুর শুকিয়ে কালো কাদা, উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি অপসারণ করে সঠিক মাত্রায় চুন প্রয়োগ করে মাছ মজুদ করতে হবে।
  • মাছের স্বাদ বৃদ্ধির নিমিত্তে মাছের দেহের দুর্গন্ধ দুরীকরনের জন্য মাছ বিক্রির ২ দিন পূুর্বে নতুন পুকুরে  স্থানান্তর করে ৪৮ ঘন্টা পানির প্রবাহ দিতে হবে। এতে মাছের গন্ধ দূর হবে ফলে ভোক্তাদের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে।
  • মাছের বাজার চাহিদা সৃষ্টি ও মূল্য বৃদ্ধির জন্য ফিলেট, পিস, রান্নার জন্য প্রস্তুত করে মৎস্যপণ্য বাজারজাত করতে হবে ।

৬. থাই পাংগাসের খাদ্য প্রস্তুত, সংরণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি
সম্প্রতিককালে দেশে মাছ চাষের ব্যাাপক প্রসার ঘটেছে এবং দেশের প্রাণীজ আমিষ চাহিদা পূরণে মাছ উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রেখে চলেছে। মাছ চাষের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত উপকারিতার দিকগুলো আজ সর্বজনস্বীকৃত। লাভজনক ভিত্তিতে মাছের চাষ অর্থাৎ বেশি করে উৎপাদন পেতে হলে উন্নতমানের খাদ্য প্রয়োগ অপরিহার্য । অন্য দিকে মাছের খাদ্যের খরচ মাছ চাষে একক বৃহত্তম খরচের বিষয়ও বটে। দেশে বর্তমানে একদিকে খাদ্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং অন্যদিকে বানিজ্যিক প্রজাতির মাছের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় মৎস্যচাষীরা বিপাকে পড়েছেন। এ অব¯হার পরিপ্র্রেেিত মাছ চাষকে লাভজনক করার ল্যকে সামনে রেখে মাছের সঠিক পুষ্টি চাহিদার নিরিখে যদ্দুর সম্ভব স্বল্পমূল্যের মৎস্য খাদ্য উৎপাদন ও যথাযথ প্রয়োগ পদ্ধতি উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৬.১ মৎস্য খাদ্য
যেসব দ্রব্য গ্রহনের ফলে মাছের দেহের বৃদ্ধিসাধন, য়পূরণ, তাপ ও শক্তি উৎপাদন এবং বংশবৃদ্ধি ঘটে সেগুলোকে মাছের খাদ্য বলা হয়। অন্যকথায়, মাছের নিয়মিত দৈহিক বৃদ্ধি, সুস্থ ও সবল থাকার জন্য এবং পানিতে তার স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য মাছ যা খায় তাই মাছের খাদ্য। আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য খাদ্য একটি অপরিহার্য উপাদান।

৬.২ মাছের খাদ্য উপাদান এবং উৎস্য
মাছের খাদ্য তৈরীতে ব্যবহার করা যায় এমন অনেক সম্ভাবনাময় খাদ্য উপাদান আমাদের দেশে সহজেই পাওয়া যায়। মাছের খাদ্য হিসেবে চালের কুঁড়া, গমের ভূসি, ভূট্টা, সরিষা/ তিলের খৈল সচরাচর ব্যবহƒত হয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে ভাল মানের ফিশ মিল পাওয়া যায় না। বাজারে ¯হানীয়ভাবে তৈরীকৃত ফিশ মিল এবং চেওয়া মাছের শুটকীর গুঁড়া পাওয়া যায়, তা তেমন মানসম্মত নয়। বর্তমানে অনেকেই আমদানীকৃত প্রোটিন কনসেনট্রেট ও মিট ও বোন মিল মাছের খাদ্যে প্রাণীজ আমিষের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন দেশ হতে আমদানীকৃত মিট ও বোন মিলে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও বিশেষ করে ফাইবার আধিক্য থাকায় মৎস্য/ চিংড়ি খাদ্যে এদের ব্যবহার শতকরা ৩০ ভাগের বেশী না করাই বাঞ্চনীয়। উল্লেখ্য যে, পুষ্টিমান বজায় রাখার স্বার্থে মৎস্য খাদ্যে স্বল্প পরিমানে হলেও এক বা একাধিক প্রাণীজ খাদ্য উপাদান ব্যবহার করা প্রয়োজন। মাছের খাদ্য তৈরীতে প্রয়োজনীয় সকল উপাদান সঠিক পরিমানে ব্যবহার করতে হবে যাতে প্রস্তুতকৃত খাদ্যে মাছের যথাযথ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি তথা- আমিষ, øেহ বা তেল, শর্করা, ভিটামিন ও খনিজ লবন বিদ্যমান থাকে। খাদ্যে কোন বিশেষ পুষ্টির ঘাটতি থাকলে মাছের উৎপাদন ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মোতাবেক বাংলাদেশে ৩৫টিরও বেশি সহজলভ্য অপোকৃত স্বল্প মূল্যের পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে যা মৎস্য ও চিংড়ির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
আমিষ (protein) জাতীয় খাদ্য উপাদান: ফিশ মিল, মিট ও বোন মিল, রেশমকীট মিল, চিংড়ির গুড়া, কাঁকড়ার গুড়া, ব্লাড মিল, তিলের খৈল, সরিষার খৈল, সয়াবিন মিল/খৈল, নারিকেলের খৈল, বাদামের খৈল, ুদিপানা, কুটিপানা, হেলেঞ্চা, বাঁধাকপি পাতা, ইত্যাদি
তৈল (lipid/fat) জাতীয় খাদ্য উপাদান: ফিশ মিল, মিট ও বোন মিল, রেশমকীট মিল, সয়াবিন তৈল, মাছের তৈল, সরিষার খৈল, তিলের খৈল
শর্করা (carbohydrate) জাতীয় খাদ্য উপাদান: চালের কুঁড়া, গমের ভূষি, গমের আটা, ভূট্টার আটা, চিটাগুড়, ইত্যাদি।

pungus feed

৬.৩ মানসম্মত খাদ্য উপাদান নির্বাচন
খাদ্য তৈরির জন্য এমন সব খাদ্য উপাদান নির্বাচন করতে হবে যেগুলোর গুণগতমান ভাল, সহজে পাওয়া যায় এবং দামেও সস্তা। অবার নির্বাচিত খাদ্য উপাদানে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান আছে কিনা তাও বিবেচনায় আনতে হবে। চালের কুঁড়া তুষমুক্ত ও মানসম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় মাছের পরিপাক (digestion) ও পুষ্টি গ্রহণ (absorption) প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। অধিক আঁশযুক্ত বা ফাইবারযুক্ত খাদ্যোপাদান বাছাইয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। কেননা খাদ্যে ফাইবারের আধিক্য খাদ্যের পরিপাচ্যতা কমিয়ে দেয়।

pungus feed standard
দেশে বর্তমানে প্রাপ্ত মৎস্য খাদ্য উপকরণের মূল্য অত্যাধিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে দেশীয় এবং আমদানীকৃত মৎস্য খাদ্য উপাদানের বেশীল ভাগের মধ্যেই নিুমান ও ভেজাল পরিলতি হচ্ছে। বাজারে প্রাপ্ত কিছু কিছু খৈলের মধ্যে ইদানিং কাঠের গুড়া, ছাই বা ভস্ম, পোড়া মাটির গুড়া, পোড়া মাবিল ইত্যাদির ভেজাল মিশ্রণ পাওয়া যাচ্ছে। খাদ্য উপাদান বা খাদ্যের জৈব রাসায়নিক গঠন যেমন- আর্দ্রতা, ভস্ম, আমিষ, স্নেহ, আঁশ, ভিটামিন এবং খনিজ লবন বিশ্লেষনের মাধ্যমে পুষ্টিমান নির্ধারণ করা যায়। খাদ্য তৈরীর পূর্বে খাদ্য উপাদানগুলিতে বিদ্যমান বিভিন্ন পুষ্টিবিরোধী উপাদান আছে কিনা তাও বিবেচনায় আনতে হবে । খাদ্য উপাদানের মানের ওপর প্রস্ততকৃত খাদ্যের মান নির্ভর করে। প্রস্ততকৃত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রনের উদ্দেশ্য হলো খাদ্য উপাদানের প্রকৃত পুষ্টির পরিমান জানা ও তদনুযায়ী খাদ্য উপাদান মেশানো হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা।  খাদ্য উপাদানের নিুলিখিত বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যগুলো পরীা  করে মানসম্মত খাদ্য উপাদান নির্বাচন করা যেতে পারে।

  • খাদ্য উপাদানসমুহ স্বাভাবিক রঙের কি না তা নিরুপণ।
  • প্রতিটি খাদ্য উপাদানের গন্ধ মুল্যায়ন, যার মাধ্যমে ঐ উপাদান টাটকা কিনা তা বোঝা যায়। পচা র্দুগন্ধ বা পোড়া গন্ধ মারাত্মক সমস্যা নির্দেশ করে।
  • খাদ্য উপাদান যদি ভেজা  বা আঠালো থাকে তাহলে বুঝতে হবে খাদ্য উপাদান নিু গুণগত মানসম্পন্ন এবং এতে ছত্রাক জন্মাতে পারে।
  • পোকামাকড় কিংবা ছত্রাকের উপস্থিতি খাদ্য উপাদানের গুণগত মানের অবনতি নির্দেশ করে।
  • ভাঙ্গা ধাতব পদার্থ, ময়লা এবং অন্যান্য অজৈবিক পদার্থের উপস্থিতি ভেজাল খাদ্যের প্রকৃতি নির্দেশ করে।
  • খাদ্যে আঁশের অধিক্য খাদ্যের পরিপাচ্যতা কমিয়ে দেয় এবং নিুমান নির্দেশ করে।

৬.৪ বাংলাদেশ মৎস্য খাদ্য ষ্ট্যান্ডার্ড – ২০০৮ মোতাবেক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদিত  পাঙ্গাস চাষে মানসম্মত খাদ্যের পুষ্টিমান/ আদর্শমাত্রা

খাদ্য চাহিদাঃ পাংগাসের ধানী পোনার ক্ষেত্রে দেহ ওজনের ১৫-২৫%, আঙ্গুলে পোনার ক্ষেত্রে দেহ ওজনের ১০-১৫% এবং বড় মাছের জন্য দেহ ওজনের ৩-৫% হারে।
৬.৫ থাই পাঙ্গাসের খাদ্য তৈরির সূত্র

pungus feeding formula
৬.৬ খাদ্য প্রস্তুত প্রণালী

  • সূত্রানুযায়ী খাদ্য উপাদানসমূহ নির্দিষ্ট পরিমাণে মেপে নিয়ে অল্প অল্প করে একটি পাত্রে ঢেলে হাত কিংবা বেলচা দিয়ে শুকনা অবস্থায় এমনভাবে মেশাতে হবে যাতে একটি সমসত্ত্ব মিশ্রণ তৈরি হয়
  • এরপর অল্প অল্প করে পানি মিশিয়ে ভালভাবে হাত দিয়ে নাড়তে হবে যাতে মিশ্রণটি একটি আঠালো পেস্ট বা মন্ডে পরিণত হয়। এই পেস্ট বা মন্ড হাত দিয়ে চেপে চেপে গোল্লা আকারে তৈরি করে ভেজা বা আর্দ্র খাদ্য হিসেবে সরাসরি মাছকে দেয়া যেতে পারে
  • সহজ পদ্ধতিতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সম্প্রতি বিএফআরআই উদ্ভবিত স্বল্প মূল্যের সেমি-অটো পিলেট মেশিন শুস্ক পিলেট বা দানাদার খাবার এবং সাধারণ পিলেট মেশিনে ভেজা পেলেট খাদ্য তৈরি করা যায়

৬.৭ শুকনা পিলেট খাদ্য তৈরি

  • নির্বাচিত ভাল মানের খাদ্য উপাদান প্রয়োজনে গ্রাইন্ডার মেশিনে ভাল করে চূর্ণ বা গুড়া করে নিতে হবে এবং তা চালুনি দিয়ে চেলে নিতে হবে।
  • সূত্রানুযায়ী খাদ্যোপাদনসমূহ শুকনা অবস্থায় পরিমাণমত মেপে নিয়ে মিক্সার মেশিনে অথবা বড় একটি পাত্রে ঢেলে হাত কিংবা বেলচা দিয়ে ভালভাবে মেশাতে হবে
  • সহজ পদ্ধতিতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সম্প্রতি বিএফআরআই উদ্ভাবিত স্বল্পমূল্যের সেমিঅটো পিলেট মেশিনে শুস্ক বা দানাদার খাবার এবং সাধারণ পিলেট মেশিনে ভেজা পিলেট খাদ্য তৈরি করা যায় ।
  • পিলেটের আকার চাষকৃত মাছের মুখের আকার অনুযায়ী তৈরি করতে হবে যাতে মাছ এই খাবার মুখে নিয়ে খেতে পারে ।
  • নির্দিষ্ট আকারের ডায়া ব্যবহার করে এটা করা যায়। পিলেট তৈরির জন্য ছোট আকারের স্বল্পমূল্যের অথবা বড় আকারের অধিক মূল্যের বাণিজ্যিক পিলেট মেশিন রয়েছে যেখানে মিশ্রণ ও পিলেট দুটোই করা যায় ।
  • তৈরি ভেজা পিলেট খাদ্য পলিথিন শিটে বা চাটাইতে রেখে ভালভাবে রোদে শুকাতে হবে ।
  • পিলেট মেশিন না থাকলে সূত্রানুযায়ী খাদ্য উপাদানসমূহের মিশ্রণে পানি মিশিয়ে গোল্লা বা বল তৈরি করে ভেজা বা আর্দ্র খাদ্য হিসেবে সরাসরি মাছকে দেয়া যেতে পারে ।

৬.৮ খাদ্য প্রয়োগ হার ও পদ্ধতি

  • মাছকে সকাল-বিকাল খাবার দিতে হয়
  • দৈনিক খাদ্য প্রয়োগমাত্রা প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, যেমন-(১) মাছের আকার ও প্রকারভেদ এবং ঘনত্ব, (২) খাদ্যের গুণাগণ ও (৩) পানির তাপমাত্রা

৬.৯ পাংগাসের উত্তম খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বিবেচ্য বিষয়সমুহ

  • পুষ্টিমান বজায় রাখার স্বার্থে পাংগাস খাদ্যে স্বল্প পরিমানে হলেও ফিশমিল বা অন্যান্য প্রাণিজ আমিষ এবং ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্স ব্যবহার করতে হবে।
  • বাণিজ্যিকভিত্তিতে মাছ চাষের জন্য শুকনা পিলেট জাতীয় খাদ্যই সবচেয়ে উপযোগী। এটি পানিতে অধিকতর স্থিতিশীল, অপচয় কম হয়, প্রয়োগ করা সহজ এবং কম তাপমাত্রায় সংরণের প্রয়োজন হয় না।
  • প্রতিদিন একই সময়ে একই জয়াগায় খাদ্য প্রয়োগে খাদ্যের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
  • পুকুরের পানির তাপমাত্রা এবং প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে খাদ্য প্রয়োগের হারও বাড়ানো বা কমানো যেতে পারে।
  • মাঝে মাঝে খাদ্য প্রয়োগস্থল পর্যবেণ করতে হবে। প্রয়োগের যথেষ্ট সময় পরে খাবার থেকে গেলে বুঝতে হবে খাদ্যের পরিমাণ বেশি হচ্ছে। সেেেত্র খাদ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে। অবশিষ্ট না থাকলে আস্তে আস্তে প্রয়োগমাত্রা বাড়াতে হবে।
  • পানিতে শ্যাওলার পরিমাণ বেড়ে গেলে খাদ্য প্রয়োগ কমিয়ে দিতে হবে বা বন্ধ রাখতে হবে। শ্যাওলা দমন করে খাদ্য প্রয়োগ আরম্ভ করতে হবে বা প্রয়োগ হার বাড়াতে হবে।

৬.১০ আহরণ পূর্ববর্তী খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাংগাস মাছের স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখা

  • পাঙ্গাস আহরণের দিন থেকে ৩০ দিন পূর্বপর্যন্ত নিুোক্ত খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছের স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব।
  • পাঙ্গাস মাছ আহরণের ১৫- ৩০ দিন পূর্বে  বাণিজ্যিক গ্রোয়ার মৎস্য খাদ্য প্রয়োগ বন্ধ করে কম ভিটামিনযুক্ত ফিনিশার খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।
  • খাদ্য প্রয়োগ হার পূর্বের তুলনায় অর্ধেক/এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিতে হবে।
  • পাঙ্গাস মাছ আহরণের ২৪-৪৮ ঘন্টা পূর্বে খাদ্য প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
  • চাষের সকল পর্যায়ে পাঙ্গাস পুকুরের পানির গুণাগুণ ঠিক রাখতে হবে। অধিক শ্যাওলা থাকতে পারবে না। শ্যাওলার আধিক্য দেখা দিলে তা দমন করতে হবে। প্রয়োজনে পানি পরিবর্তন করতে হবে।

৬.১১ আহরণ পরবর্তী সময়ে পরিচর্যার মাধ্যমে মাছের স্বাদ ও মান বজায় রাখা

  • মাছ আহরণের পর বারবার মাছকে নলকুপের পরিস্কার পানি দিয়ে ভালভাবে ধৌত  করতে হবে। পাইপ দিয়ে পানি ফাস করে আরও ভালভাবে ধৌত করা যায়।
  • পরিস্কার পানি দিয়ে বারবার ধৌত করলে মাছের গায়ের ময়লা ও শরীরের শ্লেষা চলে যাওয়ায় মাছের শরীরের অবাঞ্ছিত গন্ধ দূরীভূত হয়, মাছের দেহের রং উজ্জ্বল হয় এবং মাছ বেশিণ ভাল থাকে।
  • মাছকে তাজা অবস্থায় তাড়াতাড়ি বাজারজাত করতে হবে।
  • এসব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আহরণকৃত মাছের স্বাদ ও মান ভাল থাকবে। চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারমূল্যও বেশি পাওয়া সম্ভব হবে।

৭. থাই পাঙ্গাসের সাধারণ রোগ নির্ণয়, প্রতিকার ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
থাই পাঙ্গাস একটি উচ্চ রোগ প্রতিরোধ মতাসম্পন্ন মাছের প্রজাতি হিসাবে পরিচিত। কারণ এরা প্রতিকূল জলজ পরিবেশে অন্যান্য মৎস্য প্রজাতির তুলনায় অনেক বেশি খাপ খাওয়াতে অভ্যস্ত। তবে উচ্চ মজুত ঘনত্ব ও বদ্ধ জলজ পরিবেশে পরিত্যক্ত খাবার, মাছের বিপাকীয় বর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা পচনের ফলে পানি দূষিত হয়ে রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। কোন ট্যাঙ্ক, হ্যাচারী বা খামারে একবার জীবাণু প্রবেশ করলে তাকে সমূলে উচ্ছেদ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই খামারে জীবাণু প্রবেশের সব ধরণের পথ বন্ধ করে দেয়াই আদর্শ মৎস্য চাষির কর্তব্য। রোগের ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা সবচেয়ে সুবিধাজনক পদ্ধতি। নিুলিখিত সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব  –

  • নিরোগ ও সবল মাছের পোনা সংগ্রহ।
  • ট্যাঙ্ক/হ্যাচারী/খামার ও মাছ চাষের যাবতীয় সরঞ্জাম জীবাণু মুক্তকরণ।
  • উচ্চ মজুদ হার পরিহার করা।
  • সকল প্রকার জীবাণু বাহক দূরে রাখার ব্যবস্থা করা।
  • পরিমিত ও সুষম খাবার প্রয়োগ।
  • খামার ও মাছের পরিচর্যা নিশ্চিতকরণ।

নিম্নে থাই পাঙ্গাসের কতিপয় রোগ ও প্রতিকারের বিষয় সংেেপ বর্ণনা করা হলো –

  • পাঙ্গাস নার্সারীর রোগ বালাই
  • নার্সারীর পরিবেশ নোংরা বা পানি দুষিত হয়ে রোগ বালাই হতে পারে ।
  • অসুস্থ মাছের লণ হচ্ছে চোখ ও পেট ফুলে উঠা, বিবণ ফুলকার্  ও আঠালো শরীর ।

৭.১ লেজ ও পাখনা পচা রোগ
প্রাথমিক ভাবে Aeromonas ব্যাক্টেরিয়া পরে ফাংগাল ইনফেকশন, লেজ ও পাখনায় সাদা দাগ, রং ফ্যাকাশে, চলাফেরায় ভারসাম্য হারায় এবং একসময় মারা যায়।

  • চিকিৎসা – প্রতি কেজি খাবারে ১ গ্রাম হারে কোরোমাইসিন বা পুকুরে ২৫-৪০ গ্রাম/দিন হারে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা  চুন ১০ গ্রাম/দিন (৫ দিন পর পর ৩ ডোজ)

৭.২ পেটফুলা (ড্রপসি) রোগ

  • প্রাথমিক ভাবে ভাইরাস ও পরে Aeromona ব্যাক্টেরিয়া এই রোগ ছড়ায়
  • পট ফুলে বেলুনের মত হয়, পায়ু ফুলে লাল বর্ণ হয়
  • মাছ চলাফেরায় ভারসাম্য হারায় এবং কিনারায় জমা হয়ে একসময় মারা যায়।
  • চিকিৎসা – প্রতি কেজি খাবারে ১ গ্রাম হারে কোরোমাইসিন বা পুকুরে ২ ppm হারে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা  চুন ১০০ গ্রাম/দিন (৫ দিন পর পর ৩ ডোজ)

৭.৩ সাদা দাগ রোগ

  • ইকথায়োপথিরিয়াস মালটিফিরিস নামক পরজীবির কারনেই এই রোগ হয় । ত্বক ও পাখনায় সাদা দাগ হয় ও  দাগের স্থানে ত সৃষ্টি হয়ে মাছ মারা যায়।
  • চিকিৎসা – ৩% লবন পানিতে মাছকে আধাঘন্টা গোসল করানো যেতে পারে, মাসে দুই বার চুন ২০০ গ্রাম/দিন হারে প্রয়োগ করতে হবে।

পাঙ্গাসের সাধারণ রোগ বালাই

  • শীতকালে অপোকৃত নিম্ন তাপমাত্রায় Trichodina এবং Apisomia নামক বহিঃ পরজীবী দ্বারা অথবা পানির গুণাগুণ সহনীয় মাত্রায় না থাকলে পাংগাস মাছ রোগাক্রান্ত হতে পারে।
  • পাংগাস মাছ লালচে দাগ রোগে আক্রান্ত হলে ত্বক ও পাখনার গোড়ায় লালচে দাগ স্পষ্ট দেখা দেয় এবং কখনও কখনও মুখে ঘা দেখা দেয়। এ রোগে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোস্কা দেখা দেয়। এ অবস্থায় মাছ অস্থির ও এলোমেলোভাবে সাঁতার কাটে।
  • পুকুরে পাংগাস মাছ বহিঃ পরজীবী বা ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা আক্রান্ত হলে আক্রান্ত মাছগুলোকে জাল টেনে উঠিয়ে ১ মিলি/লিটার পানিতে ফরমালডিহাইড দ্রবণে গোসল করিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
  • আক্রান্ত পুকুরে শতাংশে ০.৫-১.০ কেজি হারে কলিচুন প্রয়োগ করলে পরিবেশের উন্নয়ন হয়।
  • শীতকালে সপ্তাহে ১-২ দিন পরিমিত পরিমাণে ডিপ টিউবয়েলের পানি পুকুরে সরবরাহ করলে পাংগাস মাছ এ ধরণের রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
  • লালচে দাগ বা লেজ ও পাখনা পচা রোগে পাংগাস আক্রান্ত হলে ০.২৫ মিগ্রা/লিটার মাত্রায় এক্রিফাভিন বা ম্যালাকাইট গ্রিন দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে ১-২ মিনিট গোসল করিয়ে পুনরায় পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে অথবা প্রতি কেজি দেহ ওজনে ১০ মিগ্রা. টেট্রাসাইকিন ইনজেকশন ১ সপ্তাহে ২ বার দিতে হবে অথাব প্রতি কেজি খাবারের সাথে ৫০ মিগ্রা. টেট্রাসাইকিন মিশিয়ে ৭ দিন খাওয়ালে লেজ ও পাখনা পচা রোগ ভাল হয়।
  • আরগুলাস বা উকুন দ্বারা পাঙ্গাস মাছ আক্রান্ত হলে প্রতি শতাংশে ৪০-৫০ গ্রাম (৪-৫ ফুট পানি) করে ডিপটারেক্স সপ্তাহে অন্তর ২ বার পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে।

৭.৪ পরজীবিজনিত রোগ
৭.৪.১ ট্রাইকোডিনিড সংক্রমণ (Trichodinid infestation)
লক্ষণ

  • মাছের অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।
  • মাছ অস্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে।
  • চৌবাচ্চার তলদেশ বা বিভিন্ন বস্তুুর সাথে গা ঘষে।
  • শ্বাসপ্রশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
  • ওজন কমে যায়।
  • ফুলকা ও ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
  • পাখনা ছিঁড়ে যায়।

চিকিৎসা

  • পুকুরে – ফরমালিন ২৫পিপিএম অথবা সোডিয়াম কোরাইড ২০০পিপিএম শুধুমাত্র একবার প্রয়োগ করতে হবে।
  • চৌবাচ্চায় গোসল – আক্রান্ত মাছকে ২৫০পিপিএম ফরমালিনে ১ঘণ্টা গোসল করাতে হবে।

৭.৪.২ লার্নিয়া  সংক্রমণ (Lernaea spp.)
লক্ষণ

  • এইসব পরজীবি মাছের গায়ে লেগে থেকে বিরক্তির উদ্রেক করে।
  • মাছ লাফালাফি করে।
  • অনেক সময় দুর্বল ও অবশ হয়ে যায়।
  • নীলাভ-ধূসর মিউকাস দ্বারা মাছের শরীর আবৃত হয়।
  • ছোট মাছ বেশি আক্রান্ত হয়।
  • ফুলকার টিস্যু ফুলে যায় ও তিগ্রস্ত হয় ফলে মাছের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

সতর্কতা

  • উন্নত পরিবেশ সংরণ ও সুষম খাবার প্রয়োগ।
  • অতিরিক্ত মাছ মজুদ পরিহার।
  • পুকুর জীবাণু মুক্তকরণ (চুন প্রয়োগের মাধ্যমে)।
  • পোনা মজুদের পূর্বে চুন প্রয়োগ।

চিকিৎসা

  • ২৫ পিপিএম ফরমালিন আক্রান্ত পুকুরে প্রয়োগ।
  • ০.৫-০.৭ পিপিএম CuSO4  আক্রান্ত পুকুরে প্রয়োগ।
  • ২-৩% NaCl – ৫-১৫ মিানট  মাছকে ধৌতকরণ ।

৭.৪.৩ আরগুলাস সংক্রমণ (Argulus spp.)
লক্ষণ

  • এটি এক ধরণের উকুন । এর আক্রমণে ছোট মাছের েেত্র দৈহিক ভারসাম্যহীনতা পরিলতি হয় ।
  • মাছকে বিভিন্ন কঠিন বস্তুর সাথে গা ঘষতে দেখা যায়।
  • আক্রান্ত স্থানে একটি গোলাকার গর্ত পরিলতি হয় যা অনেক সময় গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করে।
  • আক্রান্ত স্থানের চারপাশ ফুলে যায়।
  • মাছের আক্রান্ত অংশ পানিতে বিদ্যমান ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়াসহ বিভিন্ন জীবাণুর প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।
  • আক্রান্ত অংশে গভীর তের সৃষ্টি হয়।

পুকুরে চিকিৎসা
০.২৫ পিপিএম ডিপটারেক্স সপ্তাতে ১ বার হিসেবে পর পর ৩ বার প্রয়োগ করা যেতে পারে।

মাছের চিকিৎসা
আক্রান্ত মাছের শরীর থেকে ফরসেপের সাহায্যে উকুন উঠিয়ে ফেলা যায়। তারপর ১০ পিপিএম পটাশ অথবা ৫ পিপিএম সোডিয়াম কোরাইড দ্রবণে ১০-৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখা হয়। তবে উল্লেখিত চিকিৎসার সময়সীমা মাছের সহ্য মতার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।

৭.৫ ব্যাক্টেরিয়াজনিত রোগ
৭.৫.১ কলামনারিস সংক্রমণ (Collumnaris infection)
লক্ষণ

  • প্রাথমিক পর্যায়ে মাছের মাথা, ত্বক, ফুলকা ও পাখনায় সাদা দাগ দেখা যায়।
  • এইসব সাদা দাগ পরবর্তীতে লাল অংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত হতে দেখা যায়।
  • মাছের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ সচরাচর আক্রান্ত হয় না।

চিকিৎসা
যেহেতু এই রোগ প্রাথমিকভাবে শরীরের বাহ্যিক অংশকে আক্রমণ করে তাই বাহ্যিক চিকিৎসা অনেকাংশে সফল হয়ে থাকে।
চৌবাচ্চায় চিকিৎসা

  • ফরমালিন – ২৫০ পিপিএম দ্রবণে মাছকে ১ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখতে হবে।
  • কপার সালফেট – ২৫০ পিপিএম দ্রবণে ১ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে।

পুকুরে চিকিৎসা
ফরমালিন – ২৫ পিপিএম, ৩-৪ বার, ১ দিন পর পর পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে।
এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ
অক্সিটেট্টাসাইকিনঃ প্রতি কেজি মাছের জন্য ৫০-৭৫ মি.গ্রা হিসেবে পর পর৫-১০ দিন খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। মাছের বয়স ও রোগের তীব্রতার সাথে উল্লেখিত মাত্রার পরিবর্তন হতে পারে।
৭.৫.২ স্ট্রেপটোকক্কাস (Streptococcus spp.) সংক্রমণ
লক্ষণ

  • শারিরীক দুর্বলতা ও চলাফেরায় শৈথিল্য।
  • ক্ষুধামন্দা।
  • পায়ুপথ ফ্যাকাশে লাল হওয়া।
  • লালচে চক্ষু, ফুলকা ও মাংশ পেশী ।
  • মাছের কলিজা, বৃক্ক ও প্লীহা ফুলে যাওয়া।
  • মাছ খাড়াভাবে বৃত্তাকারে সাঁতার কাটে।
  • চোখ বাইরের দিকে বের হয়ে যায় ও কর্নিয়া অস্বচ্ছ হয়ে যায়।

এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ
ইরাইথ্রোমাইসিনঃ ৫০ মি.গ্রা./কেজি মাছের জন্য/দিন/৪-৭ দিন খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে।
৭.৫.৩ মোটাইল এরোমোনাড সেপটিসেমিয়া (Motile Aeromonad Septicaemia)
লক্ষণ

  • এইসব রোগের সাধারণ লণসমূহ স্ট্রেপটোকক্কাসে আক্রান্ত মাছের লণের সাথে প্রচুর মিল রয়েছে।
  • মাছের চলাফেরায় শৈথিল্য ও শারীরিক দুর্বলতা
  • ক্ষুধামন্দা
  • ফ্যাকাশে লাল পায়ুপথ ও পাখনার গোড়া
  • লালচে চুক্ষু
  • শরীরে বিস্তৃতি ও গভীর তের সৃষ্টি হওয়া
  • পেটে তরল পদার্থ জমা হওয়া
  • মাছের বৃক্ক, প্লিহা ও যকৃত ফুলে যাওয়া

চিকিৎসা

  • KMnO4-  ৪ পিপিএম (৪ গ্রাম/m3)/ ৩ দিন, ১ মাস ধরে দিতে হবে ।
  • আক্সিটেট্টাসাইকিন – ৫০ মি. গ্রা./কেজি মাছের/প্রতিদিন খাবারের সাথে মিশিয়ে ৪-৭ দিন খাওয়াতে হবে।

৭.৫.৪ রেড স্পট (Red spot)
Pseudomonas spp. (Pseudomonas fluorescens, P. anguilliseptica, P. Chlororaphis) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা নিম্ন তাপমাত্রায় পাংগাস মাছ আক্রান্ত হতে দেখা যায়। আক্রান্ত মাছের দেহ পৃষ্ঠে লাল দাগ এবং কখনও কখনও ক্ষত দেখা যায়।
চিকিৎসা
KMnO4-  ৩-৫ পিপিএম (৩-৫ গ্রাম/m3)/ ৩ দিন, ১ মাস ধরে দিতে হবে ।
৭.৫.৫ রক্ত সংক্রমণ (Blood infection)
Edwardsiella tarda নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা মাছ আক্রান্ত হয় ।
চিকিৎসা
BKC (Benzal Konium Chloride)৭-১০ দিন  মাছকে ধৌতকরণ
খাবারের সাথে –
Oxytetracyline:৫৫ – ৭৭ সম/শম ৭-১০ দিন
Streptomycin:৫০  – ৭৫ সম/শম ৫-৭ দিন
Kanamycin:৫০ সম/শম ৭ দিন
Sulfamid: ১৫০ – ২০০ সম/শম ৭-১০ দিন

৭.৬ ছত্রাকজনিত রোগ (Fungal Infection)
তেলাপিয়ার খামার বিশেষ করে হ্যাচারীতে ছত্রাক সংক্রমণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা । ছত্রাক সাধারণত দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণকারী জীবাণু হিসেবে পরিচিত । মাছের ত্বক, পাখনা, ফুলকা ও ডিমের উপরেরর দিক কোন কারনে য় ছিঁড়ে গেলে ছেঁড়া অংশে ছত্রাক সংক্রমণ হয়। ছত্রাক সংক্রমণের ফলে ডিম বা লার্ভি মারা যায় ।
লক্ষণ

  • মাছের গায়ে বা ডিমের উপর সাদা তুলার মত অবরণ দেখা যায়, তবে অন্যান্য বস্তুর সাথে মিশে এর রং পরিবর্তিত হতে পারে ।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর রং বাদামী হতে দেখা যায় ।
  • ছত্রাকের শাখা-প্রশাখা মাছের ত্বকে বিস্তার লাভ করে, ফলে শরীরের লবণ-ভারসাম্যতা বিনষ্ট হয় ও মাছ মারা যায় ।

সতর্কতা

  • পুকুর/হ্যাচারী জীবাণুমুক্ত ও পরিচ্ছন্নকরণ।
  • হ্যাচারী কর্মীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ।
  • হ্যাচারী যন্ত্রপাতির পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ।
  • মাছ ধরা, পরিবহন, জালটানাসহ প্রতিটি কাজে এমন সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যেন  মাছের উপর কোন চাপ সৃষ্টি না হয়। ডিম ও লার্ভির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

চিকিৎসা
৩০,০০০- ৫০,০০০ পিপিএম লবণ পানিতে আক্রান্ত মাছকে, ৩-৪ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে, তবে চিকিৎসার সময়কাল মাছের সহ্যমতার উপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনে চিকিৎসার পুনরাবৃত্তি করতে হবে ।

তথ্যসূত্র:
ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন, ড. মোঃ শাহাআলী, ড. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, ড. মোঃ আব্দুল ওহাব, ড. মোঃ সাইফুদ্দিন শাহ্ (২০১১) থাই পাংগাস মাছের পোনা উৎপাদনে হ্যাচারী ও চাষ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল; বাংলাদেশ ফিসারিজ রিসার্চ ফোরাম, ইনোভিশন কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড ও ক্যাটালিষ্ট; ঢাকা, বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ৪০।

বিস্তারিত তথ্যের জন্য তথ্যসূত্রের ডকুমেন্টটি নিচে যোগ করে দেয়া হল। ডকুমেন্টটির উৎস্য: http://www.bfrf.org

#1

Please login or Register to Submit Answer

Latest Q&A

To get new Q&A alert in your inbox, please subscribe your email here

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

Like our FaceBook Page to get updates

Are you satisfied with this site?

If YES, Please SHARE with your friends

If NO, You may send your feedback from Here

OR, Do you have any fisheries relevant question? Please Ask Here