পর্যায়ক্রম পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে মলার সাথে রুইজাতীয় মাছের মিশ্রচাষ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাই

1 answer

পর্যায়ক্রম পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে মলার সাথে রুইজাতীয় মাছের মিশ্রচাষ ব্যবস্থাপনা নিচে দেয়া হল –
জমি নির্বাচন
এদেশে বহু নিচু জমি আছে যা বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানিতে প্লাবিত থাকায় ধানের চাষ করা যায় না, তাই কেবলমাত্র শুষ্ক মৌসমে বোরো ধানের চাষ করা হয়। এসব জমি এ পদ্ধতির জন্য খুবই উপযোগী। যে জমিটি নির্বাচন করা হবে তার চারপাশে উঁচু জায়গা বা উঁচু আইল থাকতে হবে যেন বন্যার পানিতে প্লাবিত না হয়।
 
জমি প্রস্ত্ততকরণ
নির্বাচিত জমির চারপাশে সাধারণত উঁচু পাড় বা আইল থাকে। যদি কোথাও পাড় ভাঙ্গা বা নিচু থাকে তাহলে উঁচু ও শক্ত করে আইল বাঁধতে হবে যেন অতি বৃষ্টি বা বন্যায় প্লাবিত না হয়। ক্ষেতের পানি বের হওয়ার পথে বাঁশের বানা দিতে হবে যাতে মজুদকৃত মাছ বের হয়ে যেতে না পারে। তাছাড়া অতিরিক্ত পানি বের হওয়ার জন্য প্লাস্টিকের পাইপের ব্যবস্থা করতে হবে এবং পাইপের মুখে নাইলনের জাল বেঁধে দিতে হবে।
 
আগাছা নিয়ন্ত্রণ ও গর্ত খনন
বর্ষাকালে জমি পতিত থাকার ফলে বিভিন্ন ধরণের আগাছা জন্মায়। এ সমস্ত আগাছাগুলোকে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সাধারণত জমির নীচু অংশে আয়তন অনুসারে ২-৪ শতাংশ জায়গায় গর্ত করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে মাছ চলাচলের জন্য নালার প্রয়োজন হয় না। গর্তটি মাছের আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মাছ ধরতেও সুবিধা হয়। তাছাড়া বড় মাছ বিক্রি করার পর ছোট মাছগুলোকে গর্তে রেখে বড় করা যায়।
 
জমি তৈরি
জমির সমস্ত আগাছা সরিয়ে ফেলে ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। জমিতে শেষ চাষের সময় প্রতি শতাংশে ৪৫০-৫৫০ গ্রাম টিএপি এবং ২৫০-৩০০ গ্রাম এমপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া ৬০০-৭০০ গ্রাম ইউরিয়া ধান লাগানোর পর সমান তিন কিস্তিতে অর্থাৎ ধান রোপনের ৩০-৩৫ দিন, ৪৫-৫০ দিন এবং ৬০-৬৫ দিন পরে প্রয়োগ করতে হবে।
 
ধানের জাত নির্বাচন ও রোপন
বোরো মৌসুমের জন্য সাধারণত উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানই উপযুক্ত। এজন্য বিআর-৩ (বিপ্লব), বিআর-১১ (মুক্তা) ও বিআর-১৪ (গাজী) প্রভৃতি জাতের ধান নির্বাচন করা যায়। ধানের চারা সারিবদ্ধভাবে এবং সমান দূরত্বে লাগাতে হবে। এজন্য গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫-২০ সেমি. এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেমি. রাখতে হবে।
 
ধানক্ষেতের পরিচর্যা ও ধান কাটা
ধানের পরিচর্যার জন্য ক্ষেতের আগাছা, পোকা-মাকড় ও রোগবালাই দমন করতে হবে। ধানের ফলন বৃদ্ধির জন্য তিন কিস্তিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে এবং জমিতে প্রয়োজনমত সেচ দিতে হবে। ধান কাটার সময় ধানের গোড়া একটু লম্বা রেখে কাটতে হবে। তাহলে পরবর্তীতে মাছ চাষের জন্য জমিতে পানি দিলে ধানের গোড়া পঁচে গিয়ে প্রচুর প্লাঙ্কটন জন্মাতে পারে যা মাছের উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
 
মাছ চাষ
ধান কাটার পর মাছ চাষের জন্য জমির পানি নির্গমন পথে বাঁধ দিয়ে জমির পানির গভীরতা বাড়াতে হবে যাতে ধানের গোড়া তাড়াতাড়ি পঁচে গিয়ে মাছের খাদ্য উৎপন্ন হয়।
 
প্রজাতি নির্বাচন ও মজুদ ঘনত্ব
এ পদ্ধতিতে ধান ও মাছ আলাদভাবে চাষ করা হয় বলে মাছ চাষের জন্য পানির গভীরতা বেশি রাখা হয়। এছাড়া মাছকে প্রায় ৬-৭ মাস পর্যন্ত অর্থাৎ ধান লাগানোর পূর্ব পর্যন্ত ক্ষেতে রাখা যায়। তাই মলার সঙ্গে রুই, কাতলা, মৃগেল, মিরর কার্প ও সরপুঁটি মাছের পোনা একত্রে এবং অপেক্ষাকৃত বেশি মজুদ ঘনত্বে চাষ করা যেতে পারে। এজন্য প্রতি শতকে ৬০-৬৫টি মলা, ৪-৫টি রুই, ৩-৪টি কাতলা, ২-৩টি মৃগেল, ৫-৬টি মিরর কার্প ও ১০-১২টি সরপুঁটি মজুদ করা যায়।
 
মাছের পরিচর্যা
মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পানিতে যেন প্রাকৃতিক খাদ্য বজায় থাকে তার জন্য প্রতি শতকে ১৫ দিন পরপর ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৬০ গ্রাম টিএসপি প্রয়োগ করতে হবে। তার সঙ্গে ১.০-১.৫ কেজি গোবর প্রয়োগ করতে পারলে ভাল হয়। অধিক উৎপাদন পাওয়ার জন্য সম্পূরক খাদ্য হিসাবে চালের কুড়া/গমের ভুসি এবং সরিষার খৈল ২ঃ১ অনুপাতে মাছের মোট ওজনের শতকরা ৩-৫ ভাগ হারে প্রয়োগ করতে হবে। মাছের খাবার ছোট বল আকারে নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে প্রয়োগ করা উচিত।
 
মাছ আহরণ
ধান লাগানোর জন্য জমির পানি অল্প অল্প করে কমিয়ে মাছ ধরে ফেলতে হবে। মাছ খুব ভোরে ধরলে মাছ সতেজ থাকে এবং দামও বেশি পাওয়া যায়। দিনে সুর্যের তাপে মাছ তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, ফলে মাছের বাজার মূল্য কম হয়। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করলে ৬-৭ মাসের মধ্যে প্রতি শতকে ৬.২-৬.৭ কেজি মাছের উৎপাদন পাওয়া যায়।
 
ধানক্ষেতে ছোট মাছ চাষের সমস্যা
ধানক্ষেতে ছোট মাছ চাষে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন-

  • বর্ষাকালে অতি বৃষ্টিতে ধানক্ষেতের পানি আইল উপচিয়ে বা বন্যায় প্লাবিত হয়ে মাছ বের হয়ে যেতে পারে।
  • খরা বা অনাবৃষ্টিতে ক্ষেতের পানি শুকিয়ে মজুদকৃত পোনা মারা যেতে পারে।
  • কাঁকড়া ও ইদুর ক্ষেতের আইলে গর্ত করার ফলে পানি বের হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া পানি কমে গেলে সাপ, ব্যাঙ, বক, শিয়াল ইত্যাদি সহজে মজুদকৃত পোনা খেয়ে ফেলতে পারে।
  • ধানক্ষেতে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হলে কীটনাশক ব্যবহার করা মাছের জন্য ঝুকিপূর্ণ হয়ে থাকে।
  • সহজে মাছ চুরি হয়ে যেতে পারে।
  • ধানক্ষেতে মাছ চাষে জমির মালিক ও বর্গাচাষীর মধ্যে সমঝোতার অভাব পরিলক্ষিত হয়।

 
তথ্যসূত্র: DoF, Bangladesh
 

#1

Please login or Register to Submit Answer

Latest Q&A

Like our FaceBook Page to get updates



Are you satisfied to visit this site? If YES, Please SHARE with your friends

To get new Q&A alert in your inbox, please subscribe your email here

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner